স্টাফ রিপোর্টার: বরেন্দ্র অঞ্চলের বর্ষাকালীন দেশি বীজবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কৃষকের বীজ অধিকার এবং নারী কৃষকের লোকায়ত জ্ঞান রক্ষায় জাতীয় বীজনীতি পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। একইসঙ্গে বীজনীতি সংস্কার এবং কৃষক-পরিচালিত কমিউনিটি বীজব্যাংক প্রতিষ্ঠা, কৃষক-কৃষক বীজ বিনিময়ের স্বীকৃতি এবং কৃষকের অধিকার বাস্ততবায়নের দাবিও জাননো হয়েছে। কৃষক, কৃষাণী, গবেষক, পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এসব দাবি জানিয়েছেন।
রবিবার রাজশাহীর তানোর উপজেলার সিন্দুকাই গ্রামে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও গ্রিন কোয়ালিশনের আয়োজনে কমিউনিটি ভিত্তিক নীতি সংলাপে এ দাবি জানানো হয়। কমিউনিটি ভিত্তিক নীতি সংলাপে উপস্থাপিত একটি অংশগ্রহণমূলক মাঠ গবেষণায় রাজশাহীর পবা ও তানোর উপজেলার ছয়টি কমিউনিটির বর্ষাকালীন বীজ বিনিময় উৎসবের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব উৎসবে স্থানীয় কৃষক-কৃষাণীরা নিজেদের বাড়িতে সংরক্ষিত বীজ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন, পরস্পরের সঙ্গে বীজ বিনিময় করেন এবং আলোচনা করে বর্তমানে থাকা ও হারিয়ে যাওয়া বা দুর্লভ হয়ে পড়া স্থানীয় বীজ ও উদ্ভিদের নাম চিহ্নিত করেন।
মাঠতথ্যে দেখা যায়, একটি জাতের নাম হলেও সেই একই ফসলের মধ্যেও রয়েছে বহু স্থানীয় জাত এবং বৈশিষ্ট্য। বরেন্দ্র অঞ্চলে এখনও উল্লেখযোগ্য স্থানীয় বীজবৈচিত্র্য টিকে আছে। বিশেষ করে তানোরের সিন্দুকাই কমিউনিটিতে বর্ষাকালিন সবজির লাউয়ের ৪টি, মিষ্টি কুমড়ার ৪টি এবং শিমের ৪টি স্থানীয় জাতের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া মরিচের ৩টি, ঝিঙা ও পাটশাকের ২টি এবং কচুর ২টি জাতের তথ্যও পাওয়া যায়।
থানতলা কমিউনিটিতে কুমড়া, লালশাক, খাটোশিম, লম্বাশিম, কাঠরাশিম, লাউ, বরবটি, চিচিঙ্গা, তেলাকুচা, করলা, গড়আলু, জিরাধান ও বিআর-২৬ ধানসহ বিভিন্ন স্থানীয় বীজের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে গোকুল মথুরা কমিউনিটিতে স্থানীয় খাদ্য, ঔষধি ও অচাষকৃত উদ্ভিদের ২৯টি এবং মোহর হিন্দুপাড়ায় ২৭টি স্থানীয়ভাবে হারিয়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া উদ্ভিদের নাম কৃষকদের স্মৃতি ও আলোচনায় উঠে এসেছে।
এই অংশগ্রহণমূলক গবেষাণায় অংশগ্রহণকারী কৃষক, গবেষকরা সতর্ক করে বলেন, এসব সংখ্যা জাতীয় পর্যায়ের বিলুপ্তির পরিসংখ্যান নয়। এগুলো সংশ্লিষ্ট কমিউনিটির মানুষের স্থানীয় জ্ঞান ও স্মৃতিতে বর্তমানে অনুপস্থিত বা দুর্লভ হয়ে যাওয়া উদ্ভিদ ও বীজের তথ্য।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারী হরিদেবপুর এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার পরিচালনাকারী কৃষাণী মোসা: কবুলজান বলেন- তাদের এএলসিতে বিভন্ন শস্য ফসলের ১৬০ জাতের জীবন্ত বীজ আছে। এগুলো বিভিন্ন গ্রাম থেকে সংগ্রহ করে রাখা হয় এবং মৌসুম ভিত্তিক বীজগুলো বিনিময় করা হয়।
ছয়টি গ্রামের বীজ মেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমে জানা যায় নারীরাই স্থানীয় বীজব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ রক্ষক। কমিউনিটি ভিত্তিক এই নীতি সংলাপে উপস্থাপিত গবেষণায় নারী কৃষকের ভূমিকা বিশেষভাবে উঠে আসে। মাধবপুরে ৪০ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৩৮ জন, দুবইলে ৫৫ জনের মধ্যে ৪০ জন এবং সিন্দুকাইয়ে ৬০ জনের মধ্যে ৫০ জন ছিলেন নারী।
বক্তারা বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম নারীরা শুধু বীজ সংরক্ষণই করেননি; কোন গাছ থেকে বীজ নিতে হবে, কখন সংগ্রহ করতে হবে, কীভাবে শুকাতে ও সংরক্ষণ করতে হবে এবং কোন বীজ পরবর্তী মৌসুমে ব্যবহারযোগ্য এসব লোকায়ত জ্ঞানও ধারণ করে আসছেন। তাই নারী কৃষককে শুধু কৃষি কর্মসূচির “উপকারভোগী” হিসেবে না দেখে স্থানীয় বীজের জ্ঞান ও সংরক্ষণের রক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
নীতি সংলাপে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বীজ ব্যবস্থায় বীজের মান, উৎপাদন, বিপণন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনগত কাঠামো রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান কাঠামোর মধ্যে বীজ আইন, ২০১৮ এবং বীজ বিধিমালা, ২০২০ রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় এখন প্রয়োজন কমিউনিটি বা অঞ্চল ভিত্তিক বীজ রেজুলেশন থেকে বীজ ব্যবস্থাপনা কমিউনিটি ভিত্তিক করা। অর্থাৎ শুধু কোন বীজ বাজারে বিক্রি হবে তা নয়; বরং কে বীজ সংরক্ষণ করবে, কে বিনিময় করবে, কার জ্ঞান স্বীকৃতি পাবে এবং স্থানীয় বীজবৈচিত্র্য কীভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত হবে, এসব প্রশ্নকেও জাতীয় বীজনীতির অংশ করতে হবে।
কমিউনটি ভিত্তিক নীতি সংলাপে দুটি উপজেলার ছয়টি কমিউনিটির বর্ষাকালীন বীজ বিনিময় উৎসবের তথ্য বিশ্লেষণ করের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বারসিক’র নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম।
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন- আমাদের বীজ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে; এখন প্রয়োজন কৃষকের বীজ সার্বভৌমত্বের শাসনব্যবস্থা। সংলাপে আরো উপস্থিত ছিলেন- সিন্দুকাই নারী সংগঠনের সভাপতি পরি টুডু, আদিবাসী নেতা গনেস সরেন, বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার অমৃত কুমার সরকারসহ প্রমূখ।#