স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীর দুর্গাপুরে জমি দখলকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় ফেরদৌসী বেগম (৫০) নামের এক নারী নিহত হয়েছেন। এছাড়া আশঙ্কাজনক অবস্থায় আরও তিন জনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় শিশুসহ উভয় পক্ষের প্রায় ১৫ জন আহত হয়েছে।
শনিবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়নের তিউরকুড়ি এলাকায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক ৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছে।
সংঘর্ষে আহতরা হলো, একই গ্রামের পচা মন্ডলের ছেলে আবদুল জব্বার (৬৫), আলম (৪০), জেহেরের ছেলে সাইদুর রহমান (৪০), আতাউর রহমানের ছেলে জিন্নাত (৫০), আকবর আলীর মেয়ে জেসমিন (৩০), আবুল কালাম (৪৫) ও তার ছেলে সাকিব (১৭), মৃত আবদুস সামাদের স্ত্রী রজুফা বেগম (৬৫), ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে মামুন (৩৮), ফয়েজ উদ্দিনের মেয়ে জায়েদা, হাফিজুরের স্ত্রী জাহানারা, মুনছুরের ছেলে সাইনুল, ইয়াদ আলীর ছেলে সাইদুর ও ইসলামের স্ত্রী রাজিয়া। আহতদের উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম ও বিএনপি নেতা মামুনুর রশীদের মধ্যে দ্বন্দ চলে আসছিলো। খিদ্র লক্ষিপুর গ্রামের জব্বার ও সাইদুর প্রায় ৪২ বছর ধরে বিবাদমান জমিতে পান চাষ করে আসছিলেন।
গত ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একই গ্রামের বিএনপি নেতা মামুন সেই জমি তার নানার দাবি করে দখলের চেষ্টা করতে থাকে।এ নিয়ে গত ৭ ফেব্রুয়ারি সেই পানবরজে আগুন ধরিয়ে দেয় মামুন। এমনকি স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রিয়াজুলের জমি তাদের দাবি করে দখল নেয়ার চেষ্টায় জমিতে থাকা একাধিক আমগাছ কেটে ফেলেন মামুন। সেই সাথে সরিষা ক্ষেতও কেটে ফেলে তারা।
স্থানীয়রা জানান, শনিবার বেলা ১১টার দিকে বিবাদমান জমিতে থাকা পানবরজে পানি সেচ কাজের জন্য যান আব্দুল জব্বার। এ সময় মামুন, সাইদুল, সুজনসহ ১০ থেকে ১২ জন পরিকল্পিত ভাবে লাঠি ও ধারালো হাসুয়া নিয়ে তাদের উপরে হামলা চালায় এবং এলোপাতাড়ি মারপিট শুরু করে। এ সময় আব্দুর জব্বারের স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম এগিয়ে গেলে তাকেও ব্যাপক মারপিট করে। এতে ফেরদৌসী বেগম ঘটনাস্থলেই মারা যান।
প্রত্যক্ষদর্শী তসলিমা বিবি বলেন, আমার চোখের সামনে মামুন তার দলবল নিয়ে জব্বার ও আলমকে হাসুয়া দিয়ে কোপাতে থাকে। আমি প্রাণ ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসি।
দেলুয়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বলেন, আদালতে এই জমি নিয়ে মামলা চলছে। মামলায় আদালত ১৪৪ ধারা জারি করেছেন। কিন্তু আদালতের ১৪৪ ধারার আদেশ ভঙ্গ করে প্রতিপক্ষ মৃত মুনছুর রহমানের ছেলে সাইনুল, মৃত ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে মামুনুর রশিদ, মামুনুর রশিদের ছেলে জাহিদ হাসান, মৃত আঃ সামাদের ছেলে সুজন, আলেপের ছেলে রুবেল, ইয়াদালির ছেলে সাইদুল, নুর ইসলামের ছেলে রাজিবসহ ভাড়াটে লোকজন নিয়ে গত ৭ ফেব্রুয়ারি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমার জমিতে থাকা আমগাছ গুলো কেটে নিয়ে জমি জবর দখল করে। বাধা দিতে গেলে আমার লোকজনকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করা।
রিয়াজুল ইসলাম আরও বলেন, শনিবার ফের জমি দখল করতে আসলে আমার লোকজন বাধা দেয়। এ সময় প্রতিপক্ষের ভাড়াটে লোকজন আমার পক্ষের মধ্যবয়সী এক নারীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। ঘটনার পর দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে থানার মুল ফটকে বিক্ষোভ করেছে এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রায় ৪২ বছর ধরে ক্ষিদ্রলক্ষীপুর মৌজায় আরএস ৬৯ ও ৭০ নং খতিয়ানের প্রায় এক একর ৩ শতাংশ জমি ভোগদখল করে আসছেন ভুক্তভোগী রিয়াজুল ইসলাম, মোহাম্মাদ আলী, আলমগীর ও মিরাসহ তাদের স্বজনরা। তবে ওই জমি আরএস খতিয়ানের প্রজা প্রতিবেশী মৃত ডুমন মন্ডলের ওয়ারিশগনের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে ২০২৪ সালে উভয়পক্ষ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারায় আদালতে মামলা করেন এবং মামলাটি আদালতে চলমান আছে।
এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুঠিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় এক নারী নিহত হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে থানা পুলিশ কয়েকজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
দুর্গাপুর থানার ওসি দুরুল হোদা জানান, এ ঘটনায় ফেরদৌসী বেগম নামের এক নারী নিহত হয়েছে। এজাহার দায়ের না হলেও হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৮ জনকে আটক করা হয়েছে।