২ বৈশাখ, ১৪৩৩
১৬ এপ্রিল, ২০২৬

হামের লক্ষণ নিয়ে শিশুর মৃত্যু একশ ছাড়াল

Admin Published: April 4, 2026, 11:21 am
হামের লক্ষণ নিয়ে শিশুর মৃত্যু একশ ছাড়াল

ডিএনএন ডেস্ক: দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে পাঁচ হাজার ৭৯২ শিশু। এদের মধ্যে ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯ জনের শরীরে সরাসরি হামের জীবাণু শনাক্ত হয়েছিল।গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে এসব তথ্য জানানো হয়। অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৪৭ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ সময় ৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং মারা গেছে আরও তিন শিশু।


উচ্চঝুঁকিতে একাধিক এলাকা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৮ মার্চ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৬ জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার, বরগুনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর জেলা উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন ও বরিশাল সিটি করপোরেশনকেও হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জনসংখ্যার অনুপাতে কক্সবাজারে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি।


বিভাগভিত্তিক চিত্র

গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ সংক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে। এখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৩১৫ জন এবং উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে দুই হাজার ৩৯৪ জন। সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে এক হাজার ১৯২ জন। 


চট্টগ্রাম বিভাগে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১৯৯ জন। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭১৭ শিশু, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২২৮ জন। বরিশাল বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৬। এখানে উগর্সগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৫৯ শিশু,  ছাড়পত্র পেয়েছে ১২৪ জন। খুলনা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৯ শিশু। নতুন ভর্তি 

১৮ জন এবং ছাড়পত্র পেয়েছে পাঁচজন। ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৪। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৮৬ শিশু এবং ছাড়পত্র পেয়েছে ৪৯ জন। 


তথ্য সংশোধন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এর আগে প্রকাশিত তথ্য সংশোধন করে নিশ্চিত মৃত্যুর তালিকা থেকে পাঁচজনকে বাদ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জেলা পর্যায় থেকে ভুল তথ্য পাঠানোর কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া (তিনজন), লক্ষ্মীপুর (একজন) ও চাঁদপুর (একজন) জেলার এসব মৃত্যু জাতীয় হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে একজনের মৃত্যুর তথ্য যুক্ত হয়েছে।


জরুরি টিকাদান কর্মসূচি

উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে সরকার। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, প্রাথমিকভাবে বেশি আক্রান্ত এলাকায় দুই সপ্তাহব্যাপী এই কার্যক্রম চলবে। ইতোমধ্যে ২০ থেকে ২১টি উপজেলা চিহ্নিত করা হয়েছে।


স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল

গত বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


ঢাকার উত্তর সিটিতে টিকা

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পাঁচটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডে ১০টি স্থায়ী কেন্দ্রে টিকাদান কার্যক্রম চালানো হবে। আগামীকাল রোববার থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে। ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের এই কর্মসূচির আওতায় টিকা দেওয়া হবে।


সংক্রমণ প্রতিরোধে তিন পরামর্শ

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন সমকালকে বলেন, আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা নিশ্চিতে স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। দ্রুত টিকা দিতে হবে। যেটি সরকার রোববার থেকে শুরু করছে। হাসপাতালে হাম নিয়ে আসছে এমন রোগীর বাড়ির আশপাশে গিয়ে নতুন রোগী শনাক্ত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, টিকাদানে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এই সংকট কাটাতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের পাশাপাশি দক্ষতার ভিত্তিতে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় দায়িত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে কমিউনিটির সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।


গোপালগঞ্জে ১০ মাসের শিশুর মৃত্যু

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গোপালগঞ্জে ১০ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। একই সঙ্গে জেলার সব হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার টেংরাখোলা ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গা গ্রামের তুহিন শেখের ১০ মাস বয়সী মেয়ে তুবা ইসলাম তোহা গত ২৭ মার্চ ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। সে হামের উপসর্গে আক্রান্ত ছিল বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।


এ ঘটনায় সিভিল সার্জন ডা. আবু সাঈদ মোহাম্মদ ফারুক চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেছেন। তিনি জানান, কমিটি ঘটনাস্থলে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবে এবং সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।


রাজশাহীতে উদ্বেগজনক চিত্র

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের সংক্রমণে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে ২৯ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আড়াই মাসে ৫৩ শিশু বিভিন্ন কারণে মারা গেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের শরীরে হামের লক্ষণ ছিল। মাত্র দুই সপ্তাহেই ৪৪ শিশুর মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। হাসপাতালে শয্যা সংকট তীব্র। এক বেডে একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, অনেককে রাখা হচ্ছে বারান্দায়। আইসিইউ সংকটও প্রকট।


অন্যান্য স্থানের চিত্র

বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় গত এক সপ্তাহে হামে আক্রান্ত হয়ে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে একাধিক শিশুকে একই বেডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।


মানিকগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১০ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে অন্তত ২০ শিশু চিকিৎসাধীন।

এদিকে চট্টগ্রামে হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশই টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়েছে। অধিকাংশ শিশুর বয়স ৪ থেকে ৯ মাসের মধ্যে। চিকিৎসকরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই সংক্রমণ বাড়া উদ্বেগজনক এবং বিষয়টি নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।


ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের প্রকোপ বাড়ায় নতুন আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৬৮ শিশু চিকিৎসাধীন। ইতোমধ্যে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জেলা পর্যায়ে ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষ নজরদারি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।