নুরুজ্জামান : প্রতিশ্রুতি তো থাকেই। কেউ কাউকে ছেড়ে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি, কখনো ভুলে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি, সারাজীবন পাশা-পাশি পথ চলার প্রতিশ্রুতি। অথচ হৃদয় তোলপাড় করা সেই সম্পর্ক গুলোই এক সময় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়! যে মানুষটিকে ছাড়া একদিন একটি মুহূর্তও কল্পনা করা যেত না , সময়ের ব্যবধানে সেই মানুষটিই হয়ে ওঠে দূর আকাশের কোনো এক অচেনা তারা। অনেকেই ভুলে যায়, আবার অনেকেই ভুলে যাওয়ার অভিনয় করতে-করতে সারাজীবন মনে রেখে দেয়। তবু একজন আরেক জনকে ছেড়ে যায়। ঘাস, মাটি, আকাশ সাক্ষী রেখে কে-কাকে কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল , সেসব কথা আর কেউ মনে করিয়ে দিতে আসে না।
নিলা আর অয়নের গল্পটা ছিল এমন । তারা একই কলেজে পড়তো । কোন এক বর্ষার বিকেলে তাদের পরিচয়, তারপর একটু একটু করে ভালো লাগা , এরপর হটাৎ বৃষ্টি । সেই বৃষ্টিতে এক ছাতার নিচে দাড়িয়ে পথ চলা । অয়ন একদিন নিলার হাত ধরে বলেছিল, তোমাকে কখনো ছেড়ে যাব না। নিলা হেসে বলেছিল, কথা দিলে ? অয়ন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, হ্যা কথা দিলাম। সেই কথাটুকু বিশ্বাস করেই নিলা তার সমস্ত আগামীকাল অয়নের নামে লিখে দিয়েছিল। কিন্তু মানুষের জীবন তো শুধু প্রতিশ্রুতির নিয়মে চলে না। সংসারের দায়িত্ব, চাকরির অনিশ্চয়তা আর সময়ের ব্যস্ততায় অয়ন ধীরে ধীরে বদলে গেল। রাত জেগে কথা বলা ছেলেটি একদিন ফোন রেখে বলল, আজ খুব ক্লান্ত , কাল কথা বলব। সেই কাল আর ঠিকমতো আসেনি।
নিলা প্রথম দিকে অভিমান করত, কাঁদত, আবার নিজেই নিজেকে বোঝাত-মানুষটা খারাপ সময়ের মধ্যে আছে। একটু ধৈর্য ধরলেই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। অথচ সে জানত না , অপেক্ষা করতে করতে একসময় মানুষ নিজের ভেতরেই নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে । এক রাতে নিলা জিজ্ঞেস করেছিল, অয়ন, তুমি কি আর আমাকে ভালোবাসো না ? অয়ন বলেছিল, ভালোবাসা দিয়ে কি সবকিছু হয় ? জীবন টাও তো বুঝতে হবে। সেদিন নিলা আর কিছু বলেনি। শুধু মনে মনে ভেবেছিল, জীবন বুঝতে গিয়ে মানুষ কখনো কখনো সবচেয়ে আপন মানুষ টাকেই বুঝতে ভুলে যায়। তারপর একদিন অয়ন নিজেই বলল, তাদের আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত। নিলা কাঁদেনি। শুধু শেষবারের মতো জানতে চেয়েছিল, তুমি কি কোনো দিন ফিরে আসবে ? অয়ন উত্তর দিতে পারেনি। সেই নীরবতাই ছিল তাদের সম্পর্কের শেষ বাক্য।
সব গল্পই হঠাৎ ফুরিয়ে যায়। তারপর আর বলার মতো কোনো গল্প থাকে না। থাকলেও সে সব গল্প শোনার জন্য কারও সময় থাকে না । ফোন নম্বর মুছে যায়, পুরোনো এসএমএস ডিলিট হয়ে যায়, ফেসবুকের পরিচিত নাম গুলোও এক সময় হারিয়ে যায় চোখের আড়ালে। নিলা আর আগের মতো না খেয়ে অপেক্ষা করে না। অয়নের ফোন আসবে বলে রাত জাগে না। জীবন তাকে শিখিয়ে দেয়, অপেক্ষা না করেও বেঁচে থাকা যায়। বেঁচে থাকতে হবে । নিজের জন্য, পরিবারের জন্য ।
অনেক দিন পর এক বিকেলে বইমেলায় তাদের দেখা হয়। অয়ন কিছুক্ষণ নিলার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, কেমন আছ ? নিলা মৃদু হাসে। ভালো আছি। তুমি ? আমিও। কত কথা জমে ছিল দু’জনের বুকে! অথচ বলার মতো কিছুই খুঁজে পেল না কেউ। বিদায়ের আগে অয়ন শুধু বলল , আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো । নিলা একটু থেমে বলল, ক্ষমা করে দিয়েছি। তবে জানো, মানুষ সব সময় চলে যাওয়ার কারণে কষ্ট পায় না। কখনো কখনো কষ্ট পায় এই ভেবে যে, যে মানুষটা একদিন ছেড়ে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার কাছেই এক সময় নিজের থাকার অধিকারটুকু হারিয়ে ফেলেছে। অয়ন মাথা নিচু করল। নিলা চলে গেল। অয়ন দাঁড়িয়ে রইল সেই পুরোনো স্মৃতির সামনে, যেখানে একদিন তাদের দু’জনের জন্য একটি ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করত।
হৃদয় বিকিকিনির গল্প শেষ করে ছেলেটি আর মেয়েটি হয়তো যে যার মতো ভালো থাকে। হয়তো কেউই-ভালো থাকে না। নতুন সকাল আসে, নতুন মানুষ জীবনে জায়গা করে নেয়, পুরোনো গল্পের ওপর জমে ওঠে সময়ের ধুলো। তবু কোনো এক বৃষ্টির বিকেলে নিলার মনে পড়ে যায় , ছোট্ট ছাতাটির নিচে একসাথে পথ চলার কথা। আর কোনো এক নিঃসঙ্গ রাতে অয়নের মনে পড়ে, সেই মেয়েটির সাথে গল্প করার কথা । তারা এক সময় সামান্য সময় টুকুর জন্য একজন আরেক জনের অধীর হয়ে অপেক্ষা করত।
আসল কথা হল-প্রতিশ্রুতি তো থাকেই । কেউ কাউকে ছেড়ে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি, কেউ কাওকে কখনো ভুলে না প্রতিশ্রুতি । অথচ সব প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা যায় না। কিছু কথা থেকে যায় স্মৃতিতে , কিছু মানুষ থেকে যায় দীর্ঘশ্বাসে। আর কিছু ভালোবাসায়-দু’জন মানুষ বেঁচে থাকার পরও, চিরকাল অসমাপ্তই থেকে যায়। হয়তো কেউ ভালো থাকে, আবার কেউই ভালো থাকেনা...!