নুরুজ্জামান : নিজেকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা মানে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয় , বরং নিজের চিন্তা , ব্যক্তিত্ব , আচরণ ও মূল্যবোধকে সমৃদ্ধ করে তোলা । দামি পোশাক কিংবা বাহ্যিক চাকচিক্য সাময়িক ভাবে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে , কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সম্মান অর্জন করতে হলে প্রয়োজন যোগ্যতা , সততা এবং সুন্দর চরিত্র ও মানবিক মূল্যবোধ । এ পৃথিবিতে যত প্রকার দায়িত্ববোধ রয়েছে , তার মধ্যে অন্যতম মানুষের মন জয়করে পথ চলা এবং তাদের কাছ থেকে ভালোবাসা অর্জন করা ।
আজকের গল্প যে দু’জন যুবককে তুলে ধরা হয়েছে , এদের একজন রায়হান এবং অপরজন নাবিল । একই শহরের দুই তরুণ । দুজনেরই স্বপ্ন ছিল জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া । তবে স্বপ্ন পূরণের পথ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। নাবিল মনে করত, মানুষের কাছে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে হলে নিজের সাফল্য ও সামর্থ্য জোরালো ভাবে প্রকাশ করতে হয়। দামি পোশাক, আধুনিক মুঠোফোন আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের জীবন যাপনের চলা-ফেরা আর ছবি প্রদর্শন ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস।
অন্যদিকে, রায়হান ছিল শান্ত ও সংযত। সে নিজের জ্ঞান বাড়ানো , নতুন দক্ষতা অর্জন এবং মানুষের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে বেশি মনোযোগী ছিল। নিজের কাজের মধ্য দিয়েই সে পরিচিত হতে চাইত। নাবিল প্রায়ই রায়হানকে বলত , এভাবে চুপচাপ থাকলে জীবনে এগোবি কিভাবে ? নিজের যোগ্যতা মানুষকে দেখাতে হয়। না হলে কেউ তোকে চিনবে না । রায়হান মৃদু হেসে বলত, নিজেকে জাহির করার চেয়ে নিজেকে যোগ্য করে তোলা বেশি জরুরি। আমি চাই, আমার পরিচয় আমার কথায় নয়, আমার কাজে ফুটে উঠুক। সময়ের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাবিলের পরিচিতি বাড়তে লাগল। তার ছবি ও সাফল্যের গল্পে প্রশংসা করত অনেকে। কিন্তু বাস্তব জীবনে সামান্য সমালোচনা সহ্য করা , নিজের ভুল স্বীকার করা কিংবা অন্যের মতামতকে সম্মান করার ক্ষেত্রে তার দুর্বলতা ছিল স্পষ্ট। সে প্রশংসা পেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল , কিন্তু আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেনি।
অন্যদিকে, রায়হান নীরবে নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে চলল। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে সে হতাশ না হয়ে ভুলের কারণ খুঁজত। তার বিশ্বাস ছিল, ভুল করা ব্যর্থতা নয়, বরং ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়াই প্রকৃত ব্যর্থতা। একদিন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ এল। রায়হান ও নাবিল দুজনই আবেদন করল এবং সাক্ষাৎকারের জন্য ডাক পেল। সাক্ষাৎকারে নাবিল নিজের অর্জন ও সাফল্যের কথা বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরল। সে বোঝাতে চাইল, এই পদের জন্য তার চেয়ে যোগ্য প্রার্থী আর কেউ হতে পারে না।
অন্যদিকে, রায়হান নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কথা বলার পাশা-পাশি শেখার আগ্রহ, দায়িত্ববোধ এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করার মানসিকতার ওপর গুরুত্ব দিল। সে নিজের সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করল এবং জানাল, নতুন কিছু শেখার সুযোগ পেলে সে আন্তরিকভাবে সেটি কাজে লাগাবে। কয়েক দিন পর ফল প্রকাশিত হলো। চাকরিটি পেল রায়হান। এ খবরটি শুনে নাবিল বিস্মিত হলো। একদিন সে রায়হানকে জিজ্ঞেস করল, তুই তো নিজের যোগ্যতা নিয়ে আমার মতো এত প্রচার করিস না। তারপরও তুই এগিয়ে গেলি কীভাবে ? রায়হান শান্তভাবে উত্তর দিল, সবকিছুর মূল্য শব্দের জোরে বোঝানো যায় না। খুচরা পয়সার ঝনঝনানি বেশি শোনা যায়, কিন্তু একটি নোট নীরবেই তার মূল্য বহন করে। তেমনি, নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করতে সব সময় উচ্চকণ্ঠ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কাজ, যোগ্যতা আর সততাই একদিন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে।
কথাগুলো নাবিলকে ভাবিয়ে তুলল। সে উপলব্ধি করল, এত দিন সে অন্যের চোখে বড় হওয়ার চেষ্টা করেছে, অথচ নিজের ভেতরটাকে সমৃদ্ধ করার দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি। প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সে নিজের দুর্বলতাগুলো এড়িয়ে গেছে। অথচ প্রকৃত উন্নতির জন্য প্রয়োজন ছিল সেগুলোর মুখোমুখি হওয়া। সেদিনের পর নাবিল নিজেকে বদলানোর চেষ্টা শুরু করল। সে নিজের ভুল স্বীকার করতে শিখল, অন্যের মতামত মন দিয়ে শুনতে লাগল এবং জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে সময় দিতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল, মানুষের কাছে সম্মানিত হওয়ার চেয়ে সম্মানের যোগ্য হয়ে ওঠা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সাফল্য তুলে ধরা সহজ। অনুসারীর সংখ্যা, ছবির প্রশংসা কিংবা বাহ্যিক আভিজাত্য দেখে কাউকে সফল মনে হতে পারে। কিন্তু এসবের কোনোটিই মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি নয়। মানুষের আসল পরিচয় প্রকাশ পায় তার ব্যবহার, দায়িত্ববোধ, সততা, মানবিকতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তার আচরণের মধ্য দিয়ে। অন্যকে ছোট করে বড় হওয়ার চেয়ে নিজের যোগ্যতা বাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সাফল্য। মনে রাখতে হবে, সময় মানুষের মুখোশ সরিয়ে তার প্রকৃত রূপ প্রকাশ করতে পারে , কিন্তু সেই পরিচয়কে মর্যাদাপূর্ণ করে তোলার দায়িত্ব নিজেরই । কারণ , প্রকৃত বড়ত্ব নিজেকে জাহির করার মধ্যে নয় , বরং নীরবে কর্ম , চরিত্র ও যোগ্যতার মাধ্যমে মানুষের আস্থা ও সম্মান অর্জনের মধ্যেই নিহিত।