বিশেষ প্রতিবেদক : গল্পটি অনেক পুরনো। আজ থেকে ৮০ বছর আগের গল্পটি একটি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার। কেনো শহরের গল্প নয়। সবদিক দিয়ে অনুন্নত একটি নিভৃত গ্রামের গল্প। গ্রামটির নাম পানিহার। এ গ্রামের অবস্থান রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায়।
রাজশাহী শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে গোদাগাড়ী উপজেলা সদরের ডাইংপাড়া মোড়। এখান থেকে আরও ১২ কিলোমিটার দূরের গ্রাম আইহাই। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় প্রত্যন্ত এ এলাকা সাঁওতাল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত। আইহাই গ্রামের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা সরু সড়ক পেরিয়ে পৌঁছানো যায় পানিহার গ্রামে। এখন উপজেলা সদর ছাড়াও বিভিন্ন পথ বেয়ে ওই গ্রামে যাওয়া যায়। গত তিন দশকের ব্যবধানে ওই গ্রামের পাশে গড়ে উঠেছে বাজার, দোকান-পাট।
এ গ্রামেই ৮০ বছর আগে ১৯৫৪ সালে মাটির ঘরে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি লাইব্রেরী। যখন জেলা শহর রাজশাহী তো দুরের কথা, উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগও ছিলো দুর্গম। রাস্তাঘাট ছিলো না। বিদ্যুতের আলো সেতো কল্পনারও অতীত ছিলো। অথচ সেই গ্রামে প্রতিষ্ঠা বরা হয় বই সমৃদ্ধ এক লাইব্রেরী। যার নাম ‘পানিহার পাবলিক লাইব্রেরী’।
ব্রিটিশ আমলে ১৯৪৫ সালেই অনুন্নত প্রান্তিক গ্রামে নিজের ভিটে বাড়িতে লাইব্রেরীটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এনায়েত উল্লাহ মাস্টার নামের একজন শিক্ষানুরাগী। তবে সে সময় তাঁর অন্যতম সহযোগী ছিলেন কিংবদন্তি আদিবাসী নেতা সাগরাম মাঝি। সাগরাম মাঝি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এমএলএ নির্বাচিত হয়েছিলেন। পানিহার লাইব্রেরীর পত্তন হয়েছিলো মাটির ঘরে। অনেক পরে যদিও পাশেই পাকা ঘর তৈরী হয়। কিন্তু ৮০ বছরের পুরনো সেই মাটির ঘরটি এখনো ব্যবহার হচ্ছে।
সোমবার সকালে সরেজমিন ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মাটির প্রতিষ্ঠাকালীন ঘরের পাশেই পাকা একতলা ভবন। তিন কক্ষের বারান্দা ওয়ালা এ ভবনে লেখা ‘পানিহার পাবলিক লাইব্রেরী’। প্রতিষ্ঠাকাল দেওয়া আছে ১৯৪৫ আর মঞ্জুরির সাল দেওয়া আছে ১৯৫৪। সামনে দিয়ে সরু পাকা রাস্তা চলে গেছে গ্রামের মাটির বাড়িঘর ভেদ করে। সবুজ ছায়াঢাকা মায়াবি ও স্নিগ্ধ একটি গ্রাম।
লাইব্রেরীটি পরিদর্শনে গিয়ে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। তবে লাইব্রেরীর দেওয়ালে লেখা ‘প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য একটি মোবাইল নম্বর’। সেটি লাইব্রেরীয়ান মোয়াজ্জেম হোসেনের। ওই নম্বরে কল দিয়ে পরিচয় দিতেই তিনি জানালেন, তার জমিতে ধান রোপন চলছে। তিনি মাঠে রয়েছেন। আসতে মিনিট বিশেক লাগবে।
কথা অনুযায়ী ২০ মিনিটের মধ্যে মোয়াজ্জেম হোসেন আসতে না পারলেও লাইব্রেরীর চাবি নিয়ে যথা সময়ে হাজির আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি। তিনি এসেই জানালেন, তিনি লাইব্রেরীয়ান মোয়াজ্জেম এর চাচাত ভাই। লাইব্রেরিয়ান মোয়াজ্জেম হোসেনের অনুপস্থিতে তিনিই লাইব্রেরী চালু রাখেন। তিনি লাইব্রেরী খুলে দিলেন। শুরুতেই তিনি বললেন, এখন আর তেমন পাঠক আসে না। পাঠাকের এখন বড় অভাব। তবুও প্রতিদিন খোলা হয় লাইব্রেরী। মোবাইল আর ইন্টানেটের যুগে বই পড়ার পাঠকের অভাব এখন তবে অনেকে আসেন। পছন্দের বই নিয়ে বাড়িতে গিয়ে পড়েন। সে সব বই জমা দিয়ে আবার নিয়ে যান। এখন এভাবেই কার্যক্রম চলছে এ লাইব্রেরীর।
লাইব্রেরী ভেতরে প্রবেশ করতেই নাকে বিধলো পুরনো বইয়ের ঘ্রান। টেবিল আলমারির থাকে থাকে সাজানো পুরনো বইয়ের ভান্ডার। দেওয়ালে লাগানো দেশ বিদেশের মনিষীদের ছবি। আছে রাজনৈতিক নেতাদের ছবিও। এককোনে লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠাতা এনায়েত উল্লাহর ছবি। আছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিখ্যাত লেখক, সাহিত্যিকদের বাধাই করা ছবি।
আবদুল্লাহ জানালেন, এই লাইব্রেরীর সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার বই। এমন এমন সব দূর্লভ বই ও পত্রিকার সংকলন রয়েছে যা দেশের জাতীয় লাইব্রেরীতে পর্যন্ত নেই বলে দাবি তার। লাইব্রেরীর দুটি নতুন বুক সেলফ চোখে পড়লেও বাকী সব আসবাবপত্র যেমন বুক সেলফ সব কাঠের ও প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের। পুরনো বুক শেলফগুলো ও সেই সাক্ষ্য দিচ্ছিলো।
এনায়েত উল্লাহ মাস্টার লাইব্রেরীটি প্রতিষ্ঠা করলেও শেলফগুলো সেসময় মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান, সাঁওতাল, মুন্ডা আদিবাসসহ সব বর্ণ ধর্মের মানুষ নিজ পয়সায় কিনে দিয়েছিলেন। এই লাইব্রেরীটি অসাম্প্রদায়িতার উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
এই লাইব্রেরীতে যারা কাজ করেন, তাঁরা শুরু থেকেই কোন বেতন পান না। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মনের আনন্দে লাইব্রেরী সামলে রেখেছেন তারা। বিশেষ করে লাইব্ররীয়ান মোয়াজ্জেম হোসেন আন্তরিকতার সঙ্গে আগলে রেখেছেন ঐতিহ্যের এ লাইব্রেরীটি।
প্রাচীন এ লাইব্রেরীতে গেলে যে কারো মন-প্রাণ দুটোই ভরে যাবে, যদি সে বইপ্রেমি হন। ৮০ বছর আগে প্রান্তিক এই গ্রামে এমন একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরী জ্ঞানপিপাসার সাক্ষ্য বহন করে আসছে আজো। যেন মাটির ঘরে পুরো জ্ঞানের ভান্ডার। জ্ঞান বিকশিত করার ঘরও বলা যায় এ লাইব্রেরীকে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঐতিহ্যের পানিহার পাবলিক লাইব্রেরী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গত শতকের চল্লিশের দশকের মধ্যভাগে। ঠিক ব্রিটিশ শাসনামলের শেষবেলায়। সে সময় অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে থাকা প্রত্যন্ত গ্রাম পানিহারসহ আশপাশের অনেক এলাকার মানুষের কাছে আলোকবর্তিকা হয়ে এসেছিল এই লাইব্রেরীটি। তখন বই পাঠে ছিলো আগ্রহ। জ্ঞান পিপাসু মানুষ দুরান্ত থেকে ছুড়ে আসতেন মাটির ঘরের এই জ্ঞান ভান্ডারে। বই পড়তে এসে গ্রামেও থেকে যেতেন। কারন যোগাযোগ ব্যবস্থা বলেত ছিলো না কিছুই। ছিলো শুধু মাইলের পর মাইল পায়ে হেটে চলা পথ।
এ সময় জ্ঞানের আলো ছড়ানো আলোকবর্তিকা হয়ে থাকা এ এ লাইব্রেরীটি তথ্য প্রযুক্তি আর মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটের যুগে এসে খেই হারাতে বসেছে। বইয়ের প্রতি অনাদর-অবহেলার কারনে আলো ছড়ানো লাইব্রেরীটি দীপ্তি এখন নিভতে বসেছে। পাঠক সংকট, সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হতে বসেছে এখানকার সংগ্রহে থাকা হাজারো গ্রন্থ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনায়েত উল্লাহ মাস্টার ছিলেন এক সমাজহিতৈষী। তিনিই বাড়ির পাশে ২ শতক জমির ওপর ৮০ বছর আগে গড়ে তোলেন এই লাইব্রেরীটি। বর্তমানে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া ছাড়াই দাঁড়িয়ে আছে এটি। তবু কখনো কখনো দুর্লভ বইয়ের টানে অনেক কবি-সাহিত্যিক ও গবেষকরা ছুটে আসেন এখানে।
সরেজমিন দেখা যায়, লাইব্রেরীটির এখন বেহাল অবস্থা। দেখা যায়, টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরোনো পত্রিকার ফাইল ও কিছু বই উইপোকায় খাচ্ছে। প্রতিষ্ঠাকালীণ আলমারিগুলো ঘুনে খাওয়া। ভেতরে রাখা বইগুলোর অবস্থাও করুণ।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, লাইব্রেরীটির প্রতিষ্ঠাতা এনায়েত উল্লাহর বাবা ছিলেন একজন কৃষক। কৃষক হলেও শিক্ষানুরাগী এ মানুষটি ছেলেকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুর হাইস্কুলে। ওই স্কুল থেকে বাংলা ১৩১৮ সনে এনায়েত উল্লাহ এন্ট্রান্স পাশ করেন। ওই সময়েই স্কুলের লাইব্রেরীর সদস্য হন। গ্রামে ফিরে নিজের মতো করে একটি লাইব্রেরি গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন।
এলাকায় ফিরেই এনায়েত উল্লাহ প্রথমে আইহাই গ্রামে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। মাসিক ১৫ টাকা বেতনে নিয়োগ করেন শিক্ষক। বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করতে থাকেন। সে সময় তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য বই আনতেন কলকাতা থেকে।
ওই সময় পাঠ্যবইয়ের বাইরে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় থেকে অল্প অল্প করে বাইরের বইও সংগ্রহ করতে শুরু করেন। বইয়ের মোটামুটি একটা সংগ্রহ দাঁড়ালে ১৯৪৫ সালে মাটির ঘরে প্রতিষ্ঠা করেন জ্ঞানের ভান্ডার লাইব্রেরীটি।
সেই সময় লাইব্রেরীর জন্য আরও বই সংগ্রহের জন্য এনায়েত উল্লাহ গ্রামের মানুষের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। একই সময়ে এ এলাকা থেকে এমএলএ নির্বাচিত হন তার সহপাঠী সাগরাম মাঝি। লাইব্রেরিটিকে সাজিয়ে তুলতে তিনিও সঙ্গী হন এনায়েত উল্লাহর।
লাইব্রেরিয়ান মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, লাইব্রেরীতে বিভিন্ন সাময়িকী, গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা, অনুবাদ, ধর্ম-বিজ্ঞান, কবিতার বই, গোয়েন্দা উপন্যাস এবং উদ্ভিদ ও জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর এখন প্রায় ১০ হাজার বই আছে। ২০টি আলমারিতে রাখা আছে এগুলো। পাঠকদের জন্য আছে একাধিক টেবিল ও পর্যাপ্ত চেয়ার।
গ্রন্থাগারটি ঘুরে দেখা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসিমউদ্দীন ও আবুল মনসুর আহমদ থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদ-সবার বই আছে। রয়েছে কলকাতার রজনীকান্ত দাস সম্পাদিত শনিবারের চিঠি, মাসিক মোহাম্মদী, মাহে নও, জয়তী, নতুন দিন, দৈনিক বাংলাসহ অনেক সাময়িকী। আগে এখানে নিয়মিত দৈনক পত্রিকা রাখা হলেও এখন অর্থ সংকটে কোনো সংবাদ পত্র রাখা সম্ভব হয় না।
ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ী, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, পল্লীকবি জসিমউদ্দীন, কবি বন্দে আলী মিয়া ও উত্তরবাংলার চারণকবি আব্দুল মান্নানসহ আরও অনেক গুণীব্যক্তি এই লাইব্রেরী ঘুরে গেছেন।
এখন একটি পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে চলে পানিহার পাবলিক লাইব্রেরী। বর্তমান এটির সভাপতি আব্দুল মতিন। তিনি স্থানীয় হাইস্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক। তার স্কুলে গিয়ে পাওয়া যায় তাকে। তিনি জানান, পানিহার লাইব্রেরি ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৮ সালে মঞ্জুরি পায়। সে সময় এর পরিবর্তিত নাম হয় ‘পানিহার পাবলিক লাইব্রেরী’। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হতো এটি। বছরে অনুদান আসতো ৫০০ টাকা। ১৯৮০ সালে লাইব্রেরীটিকে জেলা প্রশাসকের অধীনে আনা হয়। ২০০০ সালে জেলা প্রশাসক গ্রন্থাগারটিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অধীনে হস্তান্তরের পর আনুদান আসা বন্ধ হয়ে যায়।
আব্দুল মতিন বলেন, লাইব্রেরির জন্য আগে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে অনিয়মিতভাবে কিছু অর্থ পাওয়া যেত। তবে ২০১৭ সালের পর থেকে আবেদন করেও কোনো অনুদান পাওয়া যায়নি। আর নব্বইয়ের দশকে মাটির ঘরের পাশে পাকা ঘরটি করে দেয় উপজেলা পরিষদ।
আব্দুল মতিন বলেন, এখন আর আগের মত পাঠক আসে না এখানে। লাইব্রেরিটি বাঁচিয়ে রাখার মতো মানুষও কমে আসছে।
এ লাইব্রেরীটি একাধিকবার পরিদর্শণ করেছেন রাজশাহী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ মুহা. হবিবুর রহমান। তিনি বলেন, এ লাইব্রেরীটি নিশ্চয় জ্ঞানের ভান্ডার। মানুষকে আলোকিত করার উৎস। তিনি বলেন, এখানে বইয়ের যে সংগ্রহ তা অন্য কোনো লাইব্রেরীতে হয়ত নাই। তিনি বলেন, এত পুরোনো বই আর পাওয়া যাবে না। সেজন্য আর্কাইভ করা উচিৎ। স্ক্যান করেও বইগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব।