ডিএনএন ডেস্ক: দেশে একদিকে জলাতঙ্ক, সাপে কাটা ও সংক্রামক রোগে জীবন বাঁচাতে রোগীরা ছুটে বেড়াচ্ছেন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে। অন্যদিকে সরকারি গুদামে পড়ে থেকে মেয়াদোত্তীর্ণের পথে প্রায় ৩০ কোটি টাকার জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ভ্যাকসিন। এ অবস্থায় সরবরাহ ব্যবস্থা, বিতরণ কাঠামো ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে স্বাস্থ্য খাতে।
লালবাগের বাসিন্দা শোয়াইব হাসান গত ২৮ মার্চ বিড়ালের আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান। চিকিৎসক তাকে দ্রুত অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে তিনি দেখেন নির্ধারিত কক্ষে তালা ঝুলছে। অন্য কক্ষে গেলে জানানো হয়, সরকারি ভ্যাকসিন নেই। বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। বাধ্য হয়ে ফার্মেসি থেকে ভ্যাকসিন কিনে এনে তা প্রয়োগ করানো হয়। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অর্ণবও। রোগীদের অভিযোগ, এক ডোজের জন্যও বাইরে যেতে হচ্ছে, অথচ সরকারি গুদামে বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিন মজুত থাকলেও তা রোগীর কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ধরনের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ভ্যাকসিন মিলিয়ে প্রায় ৩০ কোটি টাকার বেশি পণ্য মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন (প্রায় ২৪ কোটি টাকার মজুত), কৃমিনাশক ওষুধ, র্যাপিড ডায়াগনস্টিক কিট, স্যালাইন ও ভাইরাস প্রতিরোধী ওষুধ। এরই মধ্যে গত ৩১ মার্চ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ১০০০ মিলির নরমাল স্যালাইনের একটি বড় অংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দেশে র্যাবিস ভ্যাকসিন ও অ্যান্টি ভেনমের তীব্র সংকট দেখা দেয়। ওই সময় বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ সত্ত্বেও মন্ত্রণালয় এসব কিনতে গড়িমসি করে। পরে মন্ত্রণালয় থেকে আন্তর্জাতিক টেন্ডারের পরিবর্তে দেশীয় একটি ওষুধ কোম্পানিকে আমদানির মাধ্যমে ওষুধ সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে (উপজেলা পর্যায়ে) অ্যান্টি ভেনম ও অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন কিনতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে জটিলতার সৃষ্টি হয়। ওই সময় ওষুধ সংকটে আক্রান্ত অনেকের মৃত্যু হয়।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে এসব জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, ভ্যাকসিন এবং সরঞ্জাম গ্রহণ ও বরাদ্দের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) কর্তৃপক্ষ। কুকুর, বেড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় এবং আঁচড়ের পর জলাতঙ্ক প্রতিরোধে প্রয়োগ করা হয় র্যাবিক্স ইমিউনোগ্লোবুলিন ৫ মিলি ইনজেকশন। এই ভ্যাকসিন সিএমএসডিতে আছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৫০ ভায়াল। এসব ভ্যাকসিন মেয়াদোত্তীর্ণ হবে ২০২৭ সালের ৩০ এপ্রিলের মধ্যে। এই ভ্যাকসিনের প্রতিটি ভায়ালের দাম ১০০০ থেকে ১৭৫৮ টাকা পর্যন্ত। মজুত থাকা ভ্যাকসিনের দাম প্রায় ২৫ কোটি ১৩ লাখ ৬ হাজার ১০০ টাকা।
ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি রোধে কার্যকর ফেভিপিরাভির ২০০ মিলিগ্রামের ১০০০ পিস ট্যাবলেট মজুত আছে। এসব ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হবে আগামী ২০৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। এ ওষুধ জাপান সরকার অনুদান হিসেবে দিয়েছে। প্রতি পিস ফেভিপিরাভির ওষুধের দাম প্রায় ২০০ টাকা। মজুত আছে প্রায় ২ লাখ টাকার ওষুধ।
অ্যান্টি স্নেক ভেনাম বা অ্যান্টি ভেনাম ১০ মিলির ১৭০ ভায়াল সিএমএসডিতে মজুত আছে। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল এসব ভায়ালের মেয়াদোত্তীর্ণ হবে। ভ্যাকসিনের প্রতিটি ভায়ালের দাম গড়ে ১৪৫০ টাকা। সেই হিসেবে মজুত ভ্যাকসিনের দাম ২ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা।
ম্যালেরিয়া নির্ণয়ের ৫৮ হাজার র্যাপিড কিট (পিভি/পিএফ ডিভাইস) রয়েছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে। এসব কিটের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ৩১ মে। প্রতিটি কিটের দাম প্রায় ৯০ টাকা। মজুত ম্যালেরিয়া র্যাপিড কিটের দাম ৫২ লাখ ২০ হাজার টাকা। ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত আরটিসুনেট ৬০ এমজি ইনজেকশন মজুত আছে ১০ হাজার ৭০০ ভায়াল। এসব ভায়ালের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২০২৮ সালের ৩১ জানুয়ারিতে। প্রতিটি ভায়ালের দাম ১০০ টাকা হারে মজুত আছে ১০ লাখ ৭০ হাজার টাকার ভ্যাকসিন।
কৃমিনাশক মেবেনডাজল ৫০০ এমজি ওষুধ দুই লটের ট্যাবলেট মজুত রয়েছে। তার মধ্যে ১৬ হাজার ৭২৪ পিস ট্যাবলেটের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর। অপর লটের ৪ কোটি ১৫ লাখ ৮৩ হাজার ২০০ পিস কৃমিনাশক ওষুধের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। মেবেনডাজল ওষুধের প্রতিটি ট্যাবলেটের দাম এক টাকার বেশি। সেই হিসেবে মজুত ওষুধের দাম প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯১২ টাকা।
চলতি বছরের গত ৩১ মার্চ ৫৯০ বোতল ১০০০ মিলির আইভি ফ্লুয়েড (নরমাল স্যালাইন) মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। ৮৭ টাকা দরের মজুত স্যালাইনের দাম প্রায় ৫১ হাজার ৩৩০ টাকা। ৫০০ মিলির ১৪ বোতল আইভি ফ্লুয়েড মেয়াদোত্তীর্ণ হবে চলতি বছরের ৩০ জুনে। ৬৮ টাকা দরের মজুত এই স্যালাইনের দাম ৯৫২ টাকা।
১ মিলি অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন মজুত আছে ১৩২০ ভায়াল। এই ভ্যাকসিন মেয়াদোত্তীর্ণ হবে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এই ভ্যাকসিনের প্রতিটি ভায়ালের দাম প্রায় ৬০১ টাকা। মজুত ভ্যাকসিনের দাম ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৩২০ টাকা।
কৃমিনাশক অ্যালবেনডাজল ৪০০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট আছে দুই লটে। তার মধ্যে ৫ হাজার ৪০০ পিস ওষুধের মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর। ৬৬ হাজার ৬০০ পিস ট্যাবলেটের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ৩০ এপ্রিল। প্রতিটি ট্যাবলেটের দাম গড়ে ৫ টাকা। মজুত ট্যাবলেটের দাম ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে জানতে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের সহকারী পরিচালক ডা. মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রতি মাসেই আমরা মজুতের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ডিস্ট্রিবিউটের জন্য চিঠি দিয়ে থাকি। সম্প্রতি চিঠি দেওয়ার পর কিছু ওষুধ বা ভ্যাকসিন ডিস্ট্রিবিউট করা হয়েছে। তবে এ মুহূর্তে আমি অফিসে নেই, ছুটিতে আছি। তাই কাগজপত্র না দেখে বিস্তারিত বলতে পারছি না।