৫ কার্তিক, ১৪৩৩
২০ অক্টোবর, ২০২৬

অবিনাশী চেতনার একুশে আজ

Admin Published: February 21, 2025, 12:10 am
অবিনাশী চেতনার একুশে আজ

ডিএনএন ডেস্ক: মাগো, ওরা বলে/সবার কথা কেড়ে নেবে...। বাঙালির মুখের কথা পাকিস্তানিরা কেড়ে নেবে, এত বড় দুঃসাহস! তীব্র বেদনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা। উর্দু গেলানোর সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল তারা। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে’ শৃঙ্খল মুক্ত হয়েছিল ‘দুঃখিনী বর্ণমালা’। আজ প্রবলভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সেই ২১ ফেব্রুয়ারি ‘মাথা নত না করা’র অমর একুশে। আজ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।১৯৫২ সালের আজকের দিনে ভাষার অধিকার আদায়ের পাশাপাশি বাংলার প্রতি ঘরে বুনে দেওয়া হয়েছিল স্বাধীনতার রক্তবীজ। সে বীজ থেকেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ২১ ফেব্রুয়ারি তাই বাঙালির স্বপ্ন সাধনার উৎসমূল হিসেবে বিবেচিত।  

প্রতি বছরের মতো আজও রাষ্ট্রীয় নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মহান শহীদ দিবস পালন করা হবে। অর্ধনমিত রাখা হবে জাতীয় পতাকা। পাশাপাশি কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। 

আজ এমন এক সময়ে অমর একুশে পালন করা হবে যখন আরও উদার উন্নত সমৃদ্ধ দেশ গড়ার দাবি উঠছে চারপাশ থেকে। বিচার পাওয়া অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক চর্চার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এসব দাবি সামনে রেখে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃপ্ত শপথে আজ পালিত হবে মহান শহীদ দিবস। 

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুযারি বাঙালি জাতিসত্তার যে স্ফূরণ ঘটেছিল তা-ই পরবর্তীতে বাঙালি জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রেরণা জুগিয়েছিল। ভাষার অধিকারের পক্ষে লড়াইয়ের পাশাপাশি, ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে একুশ ছিল বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ। নিজস্ব জাতিসত্তা, স্বকীয়তা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রাম হিসেবেও এর রয়েছে আলাদা তাৎপর্য। এদিন পাকিস্তানিদের সবচেয়ে ভালো চিনতে পেরেছিল বাঙালি। তাদের সঙ্গে যে থাকা যাবে নাÑ বুঝে গিয়েছিল।  

তারও আগে ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়। জন্ম নেয় পৃথক দুই রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের দুই অংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বাঞ্চলের মানুষ ছিল মূলত বাঙালি। মাতৃভাষা ছিল বাংলা। অপরদিকে পশ্চিমাঞ্চলে প্রচলিত ছিল সিন্ধী, পশ্তু, বেলুচ, উর্দুসহ আরও কয়েকটি ভাষা।


এ অবস্থায় পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ নেতৃত্ব সমগ্র পাকিস্তানের আনুমানিক পাঁচ শতাংশের ভাষা উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত শুরু করে। অথচ তারও অনেক আগে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষাচেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। মায়ের ভাষার প্রতি বাঙালির অনুভূতি কত তীব্র ছিল তা জানিয়ে মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম লিখেছিলেন : ‘যে সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’


কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এই অনুভূতি বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এ অঞ্চলের মানুষকে পেছনে ফেলে রাখার ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রথমে ভাষার ওপর আঘাত হানে তারা। মায়ের ভাষা বাংলা মুখ থেকে কেড়ে নিতে অপতৎপরতা শুরু করে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের আবেগ অনুভূতিকে তুচ্ছ করে উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা আসতে থাকে সরকারি মহল থেকে। গণচেতনাকে স্তব্ধ করার ভয়ংকর পথ বেছে নেয়।


এ অবস্থায় বাঙালির সামনে দুর্বার আন্দোলনের বিকল্প ছিল না। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানিদের গোয়ার্তুমির চূড়ান্ত বহির্প্রকাশ ঘটে। এদিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি রুখতে ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ। কিন্তু সকল ভয় জয় করে ছাত্ররা রাজপথে নেমে আসে। ভাষার দাবি চিরতরে স্তব্ধ করতে মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ।


মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আবুল বরকত, আবদুল জব্বার ও আবদুস সালাম, শফিক, রফিকসহ নাম না জানা আরও অনেকে। গীতিকবির ভাষায় : ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালি/তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি।’ মায়ের ভাষার জন্য ঢাকার রাস্তায় বিরল রক্তশ্রোত বয়ে গিয়েছিল সেদিন। ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ছাত্ররা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হন।

পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসে। স্বজন হারানোর স্মৃতি অমর করে রাখতে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের স্মরণে গড়ে তোলা হয় স্মৃতিস্তম্ভ। ২৬ ফেব্রুয়ারি স্মৃতির মিনার গুঁড়িয়ে দেয় পুলিশ। তবে তাতেও কোনো কাজ হয় না।


‘কোথায় বরকত কোথায় সালাম/সারা বাংলা কাঁদিয়া মরে।/যে রক্তের বানে ইতিাস হলো লাল/যে মৃত্যুর গানে জীবন জাগে বিশাল/সে জাগে ঘরে ঘরে।’ বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় ষড়যন্ত্রকারীরা।


ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি লাভ করেছে অমর একুশে। আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উদ্যাপিত হবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি সম্মান জানানোর উপলক্ষ হিসেবে দিবসটিকে গ্রহণ করেছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব। বাঙালির ভাষা-চেতনা দ্বারা তারাও আজ উদ্বুদ্ধ হবে। নিজ নিজ ভাষার প্রতি যতœবান হবে। 

প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ॥ একুশের প্রথম প্রহর থেকে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো শুরু  হয়েছে। রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান ছাড়াও, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া হয়। ক্রমে শ্রদ্ধা জানাতে আসা সাধারণ মানুষের ঢল নামে।


শহীদ মিনার ঘিরে বিভিন্ন বয়সী মানুষের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের জগন্নাথ হল, পলাশী মোড় ছাড়িয়ে নীলক্ষেত ও ইডেন কলেজে গিয়ে ঠেকে অপেক্ষারতদের সারি। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে আসা মানুষের হাতে ছিল তাজা ফুল। অনেকে সন্তানকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। সকালেও বহু মানুষ প্রভাতফেরিতে অংশ নেবেন।  

রাজধানীজুড়ে একুশের অনুষ্ঠানমালা ॥ রাজধানীতে দিনভর থাকবে একুশের অনুষ্ঠানমালা। প্রতি বছর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ঢাকার একাধিক মঞ্চ থেকে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এবার উদীচীসহ কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। তারও আগে ভাষার মাসের প্রথম দিন থেকে রাজধানীতে চলছে অমর একুশে বইমেলা।


বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এখন বইয়ের বিপুল উপস্থাপনা। সেই সঙ্গে মেলার মূল মঞ্চে আজ ভাষা সংগ্রামের ওপর বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। 

এভাবে দিনভর চলবে নানা আয়োজন। সমস্ত আয়োজনের মধ্য দিয়ে একুশের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার শপথ নেবে বাঙালি। কবির ভাষায় : ‘স্বাধীন এই বাংলা আমার/কোটি প্রাণ শহীদ মিনার/নেবই নেব, নেবই নেব/নেবই নেব আমরা মনের মতো এই দেশ গড়ে...।’ দেশ গড়ার এই শপথে নতুন করে আজ জেগে উঠুক বাঙালি- দিশাহারা সময়ে সকলের তা-ই প্রত্যাশা।