৩০ আশ্বিন, ১৪৩৩
১৫ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস

প্রবীণরা সভ্যতার জীবন্ত উত্তরাধিকার

প্রবীণরা সভ্যতার জীবন্ত উত্তরাধিকার

একসময় শিশুরা দরজার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করত—বাবা কখন ফিরবেন, মা কখন ঘরে আসবেন। সময় বদলেছে। এখন অনেক পরিবারে সেই অপেক্ষার প্রহর গুনছেন বৃদ্ধ বাবা-মা,

সন্তান কখন আসবে, কখন পাশে বসবে, দুটো কথা বলবে? মুঠোফোনে মুখ দেখা যায়, কণ্ঠ শোনা যায়; কিন্তু পাশে বসার উষ্ণতা, স্পর্শের নিশ্চয়তা ও একসঙ্গে কাটানো সময়ের বিকল্প প্রযুক্তি হতে পারেনি। প্রবীণের এই নীরব অপেক্ষা তাই শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি বদলে যাওয়া পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেরও প্রতিচ্ছবি।


১ অক্টোবর  আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য "The Age of longevity : Rethinking systems for lives' - 'দীর্ঘ জীবনযাপনের যুগ: দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুনভাবে ভাবতে হবে।’


মানুষের আয়ু বাড়ছে। তাই শুধু দীর্ঘ জীবন নয়, সেই জীবনকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ, কর্মময় ও অর্থবহ করার বিষয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। দীর্ঘ জীবনযাপনের নতুন বাস্তবতায় প্রয়োজন প্রবীণবান্ধব সমাজ - যেখানে বয়স বাড়া মানে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং সম্মান, নিরাপত্তা, অংশগ্রহণ ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকা।


একসময় একান্নবর্তী পরিবারে শিশু, তরুণ ও প্রবীণরা একই ছাদের নিচে থাকতেন। ফলে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ ও পারিবারিক ইতিহাস স্বাভাবিকভাবেই পৌঁছে যেত। নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের জন্য দূরে চলে যাওয়া, ছোট পরিবার ও ব্যস্ত জীবনযাত্রায় সেই কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে। প্রযুক্তি যোগাযোগ সহজ করেছে, কিন্তু মানুষের সান্নিধ্যের প্রয়োজন কমাতে পারেনি।


প্রবীণরা পরিবারের বোঝা নন; তাঁরা সমাজের জীবন্ত ঐতিহ্য (Living Heritage)। অবসরপ্রাপ্ত  শিক্ষক তরুণদের পথ দেখাতে পারেন। কৃষক দিতে পারেন মাটি, পানি ও ফসল সম্পর্কে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার শিক্ষা। মুক্তিযোদ্ধা তুলে ধরতে পারেন ইতিহাসের প্রত্যক্ষ স্মৃতি। উদ্যোক্তা, পেশাজীবী ও কারিগররাও দিতে পারেন বাস্তব জীবনের মূল্যবান শিক্ষা। স্থানীয় সংস্কৃতি, লোকজ জ্ঞান, পারিবারিক ইতিহাস ও সামাজিক মূল্যবোধ সংরক্ষণেও তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।


বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান ও যত্নের শিক্ষা আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যেরও অংশ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” -আত-তিরমিজি অন্য হাদিসে এসেছে, “বয়োজ্যেষ্ঠ মুসলিমকে সম্মান করা আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অংশ" (সুনান আবু দাউদ)।


হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যেও পিতা-মাতা ও শিক্ষকের মর্যাদা বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়েছে। তৈত্তিরীয় উপনিষদের বাণী “মাতৃদেবো ভব, পিতৃদেবো ভব, আচার্যদেবো ভব”। এরুপে খ্রস্টীয় ধর্মগ্রন্থেও বৃদ্ধদের সম্মানের নির্দেশ রয়েছে। ধর্মের ভাষা ভিন্ন হলেও মানবিক শিক্ষা একই। বয়োজ্যেষ্ঠরা অবহেলার নয়; তাঁরা সম্মান ও যত্নের অধিকারী।


পরিবারের ক্ষেত্রেও একটি বাস্তব সত্য মনে রাখা দরকার। যে সন্তান পেশাগত জীবনে সবচেয়ে সফল, সে সবসময় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে থাকার সুযোগ পায় না। অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা সন্তানটিই হয়ে ওঠে তাঁদের শেষ আশ্রয়। অর্থনৈতিক সাফল্য আর বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ এক বিষয় নয়। তাই সন্তানের মূল্যায়নে অর্থের পাশাপাশি মানবিকতা ও পারিবারিক সম্পৃক্ততাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।


প্রবীণকল্যাণ শুধু চিকিৎসা, ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। নিরাপদ চলাচল ও জনসেবায় অগ্রাধিকারও নিশ্চিত করা দরকার। জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক ‘প্রবীণ পরিবহন কার্ড’ চালু করে নির্দিষ্ট সরকারি ও অনুমোদিত পরিবহনে পর্যায়ক্রমে ভাড়া ছাড় দেওয়া যেতে পারে। বাসে সংরক্ষিত আসন, নিরাপদ ওঠানামা এবং চালক-সহকারীদের প্রবীণবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। কয়েকটি শহর ও নির্দিষ্ট পথে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।


হাসপাতাল, সরকারি দপ্তর, ব্যাংকসহ জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে প্রবীণদের অগ্রাধিকার সেবা প্রয়োজন। হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, বাজার, পার্ক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে ‘প্রবীণবান্ধব চলাচলপথ’ গড়ে তোলাও সম্ভব।


প্রবীণদের জীবন ও অভিজ্ঞতাকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করার আরেকটি কার্যকর ক্ষেত্র হতে পারে Genealogical Tourism বা বংশ-শিকড়ভিত্তিক পর্যটন। মানুষের শৈশবের বাড়ি, পুরোনো স্কুল, গ্রামের পথ, নদীর ঘাট কিংবা পূর্বপুরুষের ভিটা শুধু একটি স্থান নয়, এসব অনেক সময় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন প্রবীণ নাতি-নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর শৈশবের গ্রামে যেতে পারেন, পুরোনো স্কুল দেখাতে পারেন, পূর্বপুরুষের ভিটা চিনিয়ে দিতে পারেন এবং সেই স্থানগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্প বলতে পারেন। এতে ভ্রমণ শুধু বিনোদন থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, পারিবারিক ইতিহাস সংরক্ষণ এবং সম্পর্ক দৃঢ় করার একটি মানবিক মাধ্যম।


স্থানীয় পর্যায়ে মাসে একদিন ‘প্রবীণ অভিজ্ঞতা বিনিময়’ আয়োজন করেও এই সংযোগ তৈরি করা যায়। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কৃষক, মুক্তিযোদ্ধা, উদ্যোক্তা, পেশাজীবী ও কারিগররা তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা তরুণদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। এতে প্রবীণরা যেমন সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকবেন, তেমনি নতুন প্রজন্মও তাঁদের জীবনজ্ঞান থেকে শিখতে পারবে।


আজকের তরুণই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ে তোলা শুধু আজকের বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য নয়; এটি আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের জন্যও বিনিয়োগ। প্রবীণদের অবহেলা করলে সমাজ তার স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও মূল্যবান জ্ঞান হারায়। তাঁদের সম্মান করলে সংরক্ষিত হয় মানবিকতা ও সামাজিক ধারাবাহিকতা।


বয়োবৃদ্ধরা 'ব্যাকডেটেড' ! এটা মনে করা অনুচিত;  তাঁদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার মধ্যেই বেঁচে থাকে আমাদের অতীত, সমৃদ্ধ হয় বর্তমান এবং আলোকিত হয় ভবিষ্যৎ। তাদের চিরবিদায় তাই অপুরনীয় শুন্যতা ও  বেদনাবিধুর! 

লেখক : পরিচালক, বাংলাদেশ ট্যুরিজম ফাউন্ডেশন

Email: mzaman.phd@gmail.com

মোবাইল: ০১৭১১২৬১২২৫