৩ কার্তিক, ১৪৩৩
১৮ অক্টোবর, ২০২৬

রাজশাহীর নবগঙ্গা ও বারাহী নদী দখল-দুষণ বন্ধসহ পুনঃখননের দাবি

Admin Published: March 1, 2026, 5:47 pm
রাজশাহীর নবগঙ্গা ও বারাহী নদী  দখল-দুষণ বন্ধসহ পুনঃখননের দাবি

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীর পদ্মা থেকে উৎসারিত নবগঙ্গা ও বারাহী নদী দখল-দুষণ বন্ধসহ পুনঃখননের দাবি জানিয়েছে গ্রিন কোয়ালিশন, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম ও বারসিক। রবিবার বারসিক রাজশাহী রিসোর্স সেন্টার সেমিনার কক্ষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে গ্রীন কোয়ালিশন রাজশাহীর আহ্বায়ক মাহবুব সিদ্দিকী, পবা উপজেলার আহ্বায়ক রহিমা খাতুন, বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারি শহিদুল ইসলাম, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক বক্তব্য রাখেন।

বক্তারা বলেন, রাজশাহী নগরের অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে নগর সংলগ্ন নদী, বিল ও জলাধারসমূহ মারাত্মক দূষণ, দখল ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। চরমভাবাপন্ন রাজশাহীর পরিবেশ প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সম্মেলনে বলা হয়, রাজশাহী নগরের বিভিন্ন ড্রেন ও নালা দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত তরল বর্জ্য প্রবাহিত হয়ে স্মরমঙ্গলা নদী, বারাহী নদী, নবগঙ্গা নদী ও বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। পদ্মা থেকে উৎসারিত এই নদীগুলো একসময় ছিল স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। কিন্তু বর্তমানে এসব নদীর পানি কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে, তলদেশে পলি ও প্ল্যাস্টিক জমে প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে এবং মাছসহ জলজ প্রাণের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্থানীয় জেলেরা আয় হারাচ্ছেন এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশগত চরিত্র নষ্ট হচ্ছে।

নগরের বিষাক্ত তরল বর্জ্য নিম্নাঞ্চলে জমা হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করছে সাপমারার বিল, বকমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড়বাড়িয়া বিল ও কর্ণাহার বিল। হাজার হাজার হেক্টর এসব বিল দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও প্রাকৃতিক বাস্তুন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, দূষিত পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, জলজ উদ্ভিদ ও মাছের উৎপাদন কমে গেছে এবং বিলের পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ করছে।

ফলে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দূষিত পানি নিম্নপ্রবাহে নাটোর জেলার চলন বিল পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই দূষিত পানি দিয়ে চাষাবাদ চলতে থাকায় মাটির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং ফসলে ক্ষতিকর উপাদান জমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় জনগণের মধ্যে চর্মরোগ, পানিবাহিত রোগ ও দুর্গন্ধজনিত শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে মৎস্যজীবী ও কৃষকসহ নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী দূষণের সরাসরি প্রভাব বহন করছে, যা পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রশ্নও উত্থাপন করছে।

সংগঠনগুলোর মতে, এই পরিস্থিতি কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের প্রশ্ন। অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এই সংকট বৃহত্তর পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

সার্বিক এই ভয়াবহতা থেকে উত্তোরণে এবং বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সংবাদ সম্মেলন থেকে ৬ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। উত্থাপিত দাবিসমূহ হলো, পদ্মা থেকে উৎসারিত স্বরমঙ্গলা নদী, বারাহী নদী, নবগঙ্গা নদীগুলো অবিলম্বে দখল-দূষণমুক্ত করতে হবে; রাজশাহী নগরের তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অবিলম্বে আধুনিক স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন ও কার্যকর করতে হবে; সকল শিল্প, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ঊঞচ) নিশ্চিত ও কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে; বারনই, বারাহী ও নবগঙ্গা নদীসহ পদ্মা থেকে উৎসারিত অন্যান্য নদী ও সংযোগ বিলসমূহে সরাসরি ড্রেন সংযোগ, দখল-দূষণ বন্ধ করতে হবে। দখল-দূষণের উৎস শনাক্তে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে; সাপমারার বিল, বকমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড়বাড়িয়া বিলসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিল ও নদীর পানি ও মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে; নদী-বিল দখল ও ভরাট বন্ধ করে সমন্বিত পুনরুদ্ধার মাস্টারপ্ল্যান স্থানীয় জনগোষ্ঠী, তরুন-যুব, পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।