জয়পুরহাট প্রতিনিধি : জয়পুরহাটের বিভিন্ন এলাকায় সরিষা ক্ষেতের পাশেই বাণিজ্যিক ভাবে হচ্ছে মৌচাষ। এতে স্বাবলম্বী হচ্ছেন তরুণ উদ্যোক্তারা। জেলাজুড়ে সরিষা ক্ষেতের পাশে প্রায় দেড় হাজার মৌ বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। এ থেকে প্রতি সপ্তাহে মধু সংগ্রহ করছেন মৌয়ালরা। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি মধু বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা দরে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন কো¤পানি সরবরাহ করছে এখানকার মধু। চলতি মৌসুমে এ জেলায় ৩০ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জয়পুরহাট জেলার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে এখন হলুদ সরিষা ফুলের সমারোহ। সদর উপজেলার পুরানাপৈল দস্তপুর, শালগ্রাম, হালট্টি, আক্কেলপুরের জামালগঞ্জ সহ জেলার প্রায় ১০টি গ্রামের সরিষা ক্ষেতের পাশে অর্ধশত মৌয়াল বিসিক থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্থাপন করেছেন মৌমাছির বাক্স। বিগত বছরগুলোতে অন্য জেলা থেকে মৌয়ালরা বেশি আসতেন এ জেলায়। তবে এবার জয়পুরহাট জেলার অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এই মৌ চাষ করেছেন। প্রতিটি খামারে রয়েছে ৫০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত বাক্স। আর সারাদিন সরিষার ফুল থেকে মধু আহরণ করছেন মৌমাছিরা। এতে পরাগায়ন হয়ে ফলনও ভাল হচ্ছে সরিষার। এখানকার উৎপাদিত মধুর গুনগত মান ভাল হওয়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে কিনতে আসছেন সাধারণ ক্রেতারা। পাশাপাশি সরবরাহ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন কো¤পানীতে। এ থেকে বেশ লাভবান হচ্ছেন মৌয়ালরা।
সদরের শালগ্রাম এলাকায় গাইবান্ধা থেকে এসেছেন মৌচাষী সাদামিয়া। তিনি বলেন, আমরা ৪টি টিম এবার জয়পুরহাট জেলায় মধু আহরণের জন্য এসেছি। আমার খামারে ১০০টি বাক্স রয়েছে। এতে থেকে প্রায় ৪০ মণের মতো মধু উৎপাদন হবে এ মৌসুমে। আমি এসব মধু অনলাইনে বিক্রি করে থাকি। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার লোকজন মধু কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন কো¤পানীতে এসব মধু বিক্রি হয়। রংপুর থেকে আসা একই এলাকায় আসা মৌচাষী সজিব হোসেন বলেন, এখানে প্রতিবছর প্রচুর সরিষার ক্ষেত দেখা যায়। এজন্য আমরা প্রতিবছর মধু সংগ্রহ করার জন্য আসি। সরিষার ক্ষেতের পাশেই বাক্স স্থাপন করা হয়। সেখান থেকে মৌমাছিরা সারাদিন সরিষার ফুলে বসে মধু সংগ্রহ করে আনে। একটি বাক্সে প্রায় ৮ হাজার পর্যন্ত মৌমাছি থাকে। এছাড়া একটি থাকে রানী মৌমাছি। দন্তপুর গ্রামের চাষী রেজাউল ইসলাম বলেন, আগে শুধু বাহিরের জেলা থেকে মৌয়ালরা এখানে এসে মধুর চাষ করতো। কিন্তু এখন জয়পুরহাট জেলার অনেকেই এই চাষ করছেন। আমার বাড়ি জয়পুরহাট সদরের ধারকী গ্রামে। আমার খামারে ২১৭ টি বাক্স আছে। এখানে প্রতি বাক্স থেকে এক সপ্তাহ পরপর ৩ থেকে ৪ কেজি মধু সংগ্রহ করা যায়। শহরের ধানমন্ডী থেকে শালগ্রামে মধু কিনতে আসা ফজলে রাব্বী বলেন, আমার এক সহকর্মী এখান মধু কিনেছে শুনে আমিও কিনতে এসেছি। চোখের সামনেই প্রাকৃতিক পরিবেশে উৎপাদিত হচ্ছে মধু। বাজারের মধুতে অনেক সময় ভেজাল দেখা যায়। তবে এখানকার মধু অনেক ভাল। এজন্য ১ কেজি কিনেছি। সদরের শ্যামপুর গ্রামের দিপক কুমার মন্ডল বলেন, সরিষা ফুল থেকে যে মধু উৎপাদন হয় সেটা কেনার জন্য এসেছি। ছেলে-মেয়েদের খাওয়ানোর জন্য সারাবছরের মধু এখান থেকে কিনি। এবার ১ কেজি ৬০০ টাকা নিয়েছে। এই মধু খাঁটি বলেই কিনতে এসেছি।
এ বিষয়ে জয়পুরহাট বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, ফুল ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে মৌমাছি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মৌমাছি থেকে শুধু যে আমরা মধু পাই তা নয়, এ থেকে যে রয়েল জেলি পাওয়া যায় তা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এবছর ১৫ জন মৌচাষীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ শিল্পের উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন, ঋণ সহায়তা প্রদানসহ অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমে এ জেলায় ৩০ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।