১ কার্তিক, ১৪৩৩
১৬ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্ব প্রবীণ দিবস ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

Admin Published: October 1, 2025, 3:56 pm
বিশ্ব প্রবীণ দিবস ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

কৃষিবিদ মনিরুজ্জামান বাবুল : আজ ১ অক্টোবর। বিশ্ব প্রবীণ দিবস। “প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলি” প্রতিপাদ্যে  এ দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় প্রতিপালিত হচ্ছে। 

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বাংলাদেশের ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে ধরা হয়, যেখানে উন্নত দেশে ধরা হয় ৬৫ বছর। প্রবীণ জনগোষ্ঠী প্রতিটি সমাজের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, পরিবার ও জাতির দিকনির্দেশক আলোকবর্তিকা। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এই জনগোষ্ঠী প্রায়শই অবহেলিত। বয়সজনিত রোগব্যাধি, কর্মক্ষমতার অভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা প্রবীণদের জীবনে নতুন নতুন সংকট সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একাকিত্বের যন্ত্রণা, যা তাঁদের মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে। অথচ এঁরাই পরিবার ও সমাজের জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ব্যয় করেছেন।


বিশ্বের উন্নত দেশগুলো প্রবীণ অধিকার রক্ষায় ইতিমধ্যেই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জাপান প্রবীণবান্ধব সমাজ হিসেবে পরিচিত, যেখানে তাঁরা শুধু আর্থিক নিরাপত্তাই পান না, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকেন। ইউরোপের দেশগুলোতে রয়েছে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, সামাজিক অংশগ্রহণমূলক প্রোগ্রাম ও নিয়মিত ভাতা। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবীণদের জন্য পেনশন স্কিম, হেলথ কেয়ার ও আইনি সুরক্ষা চালু আছে। এসব উদাহরণ দেখায়, প্রবীণদের যত্ন কোনো দয়া নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক দায়িত্ব।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিত্রটি ভিন্ন। গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা সীমিত, আর শহরে পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়ায় প্রবীণরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। শুধু মৌলিক চাহিদা নয়, প্রবীণদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো সামাজিক যোগাযোগ ও মানসিক প্রশান্তি। এ অবস্থায় কমিউনিটি কেয়ার ফাউন্ডেশন-এর মতো মানবিক উদ্যোগ প্রবীণদের জন্য হতে পারে আশার আলো। শিশুদের জন্য যেমন ডে কেয়ার রয়েছে, তেমনি প্রবীণদের জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক ডে কেয়ার সেন্টার গড়ে তুললে তাঁরা পাবেন সঙ্গ, যত্ন, আড্ডা ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের সুযোগ। কর্মব্যস্ত পরিবার এভাবে নিশ্চিন্ত হতে পারবে, আবার প্রবীণরা পাবেন মর্যাদাপূর্ণ আশ্রয়।


একটি সমাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রবীণরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন— “একটি সমাজের সভ্যতা পরিমাপ করা যায়, তারা প্রবীণ ও দুর্বল মানুষদের কতটা যত্ন করে।” কনফুসিয়াসও বলেছেন— “যে সমাজ প্রবীণদের সম্মান করে না, তারা আসলে নিজেদের ভবিষ্যৎকে অসম্মান করে।” এই বাণীগুলো আজও প্রাসঙ্গিক।


ধর্মীয় নির্দেশনাও প্রবীণদের মর্যাদার গুরুত্ব বহন করে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) ইরশাদ করেছেন— “সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের প্রবীণদের সম্মান করে না।” (তিরমিজি)। এই হাদীস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রবীণদের সম্মান প্রদর্শন মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি ঈমানেরই দাবি।


তাহলে আমাদের করণীয় কী? পরিবারে প্রবীণদের প্রতি ভালোবাসা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা, প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা, তাঁদের একাকিত্ব দূরীকরণে কমিউনিটি ডে কেয়ার গড়ে তোলা, যুবসমাজকে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রবীণদের সমাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা—এসবই হতে হবে এখনকার অগ্রাধিকার।


বিশ্ব প্রবীণ দিবস ২০২৫ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রবীণ জনগোষ্ঠী কোনো বোঝা নয়, তাঁরা সমাজের সম্পদ। তাঁদের মর্যাদা, অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানেই নিজেদের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। কমিউনিটি কেয়ার ফাউন্ডেশন এ কাজে অগ্রণী ভূমিকা রেখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।


লেখক : গবেষক, কমিউনিটি কেয়ার ফাউন্ডেশন  বেইসড  একটিভিস্ট , উদ্যোক্তা, মমতা নার্সিং ইনস্টিটিউট, রাজশাহী