৯ ভাদ্র, ১৪৩৩
২৪ আগস্ট, ২০২৬

চলে গেলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পুরোধা পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী

Admin Published: August 12, 2025, 6:34 pm
চলে গেলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পুরোধা পণ্ডিত অমরেশ রায়  চৌধুরী

স্টাফ রিপোর্টার : উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম পুরোধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত সঙ্গীত সাধক পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী আর নেই। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টায় রাজশাহীতে নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।

তার ছেলে প্রকৌশলী অমিত রায় চৌধুরী জানান, তিনি বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। ৮-১০ দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাকে বাড়িতে আনা হয়। তবে গত পরশুদিন থেকে তার শরীর আবার খারাপ হতে থাকে। মঙ্গলবার সকালে তিনি মারা যান।

সন্ধ্যা ৬টায় রাজশাহী নগরীর পঞ্চবটি মহাশ্মশানে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বিকাল ৪টা থেকে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তার মরদেহ রাখা হয়।

পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী ১৯২৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর জেলার চৌদ্দরশি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বাইশরশির জমিদার রায় বাহাদুর মহেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরীর নাতি। তার বাবা অবিনাশ রায় চৌধুরী এবং মা রাজলক্ষ্মী রায় চৌধুরী।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মা রাজলক্ষ্মীকে নিয়ে রাজশাহীতে চলে আসেন এবং পরবর্তীতে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি স্ত্রী সোনালী রায় চৌধুরী, দুই ছেলে অভিজিৎ ও অমিত, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের রেখে গেছেন।

মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন তার মা রাজলক্ষ্মীর আগ্রহে সঙ্গীত শিক্ষার সূচনা হয় উপমহাদেশের খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ সুধীর লাল চক্রবর্তীর কাছে। তার মৃত্যুর পর তিনি তালিম নেন সিরাজগঞ্জের হরিহর শুক্লার (হৈমন্তী শুক্লার পিতা) কাছে। এরপর দীর্ঘদিন সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তীর কাছে ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুংরি ঘরানায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

তিনি আধুনিক গান, অতুলপ্রসাদী, রাগপ্রধান, নজরুল ও শ্যামা সঙ্গীতেরও তালিম নিয়েছেন নিখিলচন্দ্র সেন এবং মানস চক্রবর্তীর নিকট থেকে। কাজী নজরুল ইসলামের আদি রেকর্ড থেকে সুর উদ্ধার করে স্বরলিপি তৈরির কাজেও তিনি অবদান রেখেছেন।

পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী তার দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে দেশ-বিদেশে বহু সম্মাননা ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৬১ সালে তিনি ‘মিউজিক এডুকেশন বোর্ড অফ ঝংকার’ থেকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে ‘সঙ্গীত তীর্থ’ উপাধি লাভ করেন। এরপর ১৯৮২ সালে ঢাকায় তাকে প্রদান করা হয় ‘ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ স্মৃতি পদক’ এবং ১৯৮৭ সালে দিনাজপুরের ‘নবরূপী’ সংগীত প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ওস্তাদ কসির উদ্দিন স্মৃতি পদক’।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তাকে জাতীয় পর্যায়ে গুণীজন হিসেবে সংবর্ধনা জানায়। ২০০০ সালে দিনাজপুরের প্রাচীন সংগীত প্রতিষ্ঠান ‘নবরূপী’ তাঁকে ‘পণ্ডিত’ উপাধিতে ভূষিত করে।

২০১০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে বিশেষ সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট তাকে ‘রবীন্দ্র পদক’ প্রদান করে। একই বছর রাজশাহী শিল্পকলা একাডেমি তাকে সম্মাননা স্মারক, ক্রেস্ট ও পদক প্রদান করে। শিল্পকলা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে অবদানের জন্য তিনি ২০১৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক এবং ২০১৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।

একই বছর, ২০ মার্চ রাজশাহী নগরবাসীর পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয় এক নাগরিক সংবর্ধনা। এই সকল সম্মাননা তার অসামান্য সঙ্গীত সাধনা ও সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত। পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরীর প্রয়াণে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। দেশবাসীর জন্য তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।