স্টাফ রিপোর্টার: চারিদিকে থইথই পানি। ঘরের ভিটায় আছড়ে পড়ছে পদ্মার উত্তাল ঢেউ। গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তলিয়ে গেছে বসতভিটা, ফসলের মাঠ। কাজ নেই, ঘরে খাবার নেই। গবাদিপশু নিয়ে নিরুপায় চরাঞ্চলবাসী চেয়ে ছিলেন আকাশের দিকে। এই চরম দুর্দশার মধ্যেই এক বস্তা ত্রাণের জন্য নদীর ঘাটে শত শত নারী-পুরুষ ও শিশুর অপেক্ষা। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর শুক্রবার (১৫ আগস্ট) সকালে যখন প্রশাসনের ত্রাণের নৌকা ভেড়ে, তখন অনেকের চোখেই ছিল জলের ধারা; সে জল কষ্টের, আবার স্বস্তিরও।
রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলে শুক্রবারের চিত্র ছিল এমনই হৃদয়বিদারক। পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চরাঞ্চলগুলোর কয়েকশ পরিবার সবকিছু হারিয়ে এখন নিঃস্ব। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই মানুষগুলোর কাছে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় ইঞ্জিনচালিত নৌকা, যা উত্তাল পদ্মায় ঢেউয়ের গর্জন এক প্রকার জীবন বাজি রেখে পাড়ি দেওয়া।
সরেজমিনে শুক্রবার (১৫ আগস্ট) সকালে দেখা যায়— পদ্মা নদীর পাড়ে মানুষের দীর্ঘ সারি। ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না আর বড়দের চোখেমুখে দুঃশ্চিন্তার ছাপ। ঠিক তখনই পবা উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের একটি ত্রাণবাহী নৌকা এসে পৌঁছায়। শত শত মানুষ নৌকার দিকে এগিয়ে যান। কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, আছে কেবল বুকভরা আশা। প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজেরাই নৌকা থেকে চালের বস্তা নামিয়ে তুলে দেন অপেক্ষারত মানুষের হাতে।
ত্রাণ নিতে আসা বৃদ্ধ আলী হোসেনের গলা ধরে আসে কথা বলতে গিয়ে। তিনি বলেন, "বাবা, কয়দিন ধরে পানিতে ভাসতেছি। ঘরে একদানা চাল নাই। গরু-ছাগল কই রাখব, কী খাওয়াব, সেই চিন্তায় ঘুম আসে না। আইজ এই চাল পাইয়ে মনে হচ্ছে জানটা বাঁচল।" তার কথায় ভিজে ওঠে চারপাশের বাতাস।
আফরোজা খাতুন নামে এক নারী জানান, "নদী হামার সব কাইড়ে নিছে। ঘরটাও পানিতে ডুবে গেছে। পোলাপান নিয়ে কই যাব, কী খাব—কিছুই জানি না। এই বিপদের দিনে সরকার যে মুখ তুলে তাকাইছে, এটাই অনেক।" ১৪ কেজি চালসহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী বস্তাটি পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরেন তিনি।
চরাঞ্চলের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে শুক্রবার সকালে ১০০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে প্রতি বস্তায় ১৪ কেজি করে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত প্রতি বস্তায় খাদ্য সামগ্রী হিসেবে- চাল, ডাল, চিনি, লবণ, তেল, হলুদের গুঁড়া, ধনিয়া ও মরিচের গুঁড়া ছিল। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আরাফাত আমান আজিজ নিজে উপস্থিত থেকে পুরো ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি করেন। তিনি বলেন, "এই মানুষগুলোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এটি শুধু শুরু। যতদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হবে, আমাদের সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।"
এসময় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) প্রকৌশলী আবু বাশির বলেন, "এই দুর্গম চরাঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউএনও স্যারের তত্ত্বাবধানে আমরা জরুরি ভিত্তিতে চাল বিতরণ শুরু করেছি। আমাদের কার্যক্রম এখানেই শেষ নয়। পানি নামতে শুরু করলেই আমরা ক্ষয়ক্ষতির একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করব। সেই তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। আমরা সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছি।"
ত্রাণবাহী নৌকা যখন চর ছেড়ে ফিরছিল, তখনও নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেক মানুষ। তাদের চোখে কৃতজ্ঞতা। হাতে পাওয়া চালের বস্তা হয়তো কয়েকদিনের ক্ষুধা মেটাবে, কিন্তু তাদের দীর্ঘশ্বাস আর চোখের জল বলে দিচ্ছিল—এই সংকট কতটা গভীর। পদ্মার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে তাদের বেঁচে থাকার আরেক লড়াই। ভাঙা ঘর মেরামত, ফসল হারানোর যন্ত্রণা আর ঋণের বোঝা নিয়ে নতুন করে জীবন সাজানোর এক অসম যুদ্ধ।
এসময় উপস্থিত ছিলেন- হরিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ছাবের আলীসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গ্রামবাসী উপস্থিত ছিলেন।