স্টাফ রিপোর্টার : ‘ই মুহূর্তে জাপানে একলাখ দক্ষ জনবলের বিশাল কর্মবাজার অপেক্ষা করছে। আর সৌদি আরবে ৪০ হাজার জনবল পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে’। শনিবার রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে এ তথ্য জানিয়েছেন, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অতিরিক্ত মহাপরিচালক আশরাফ হোসেন।
তিনি বলেন, দিন বদলেছে। এখন আর অদক্ষ শ্রমিকের যুগ নেই। বিশ্ব শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। দক্ষ হয়ে বিদেশে গেলে কেবল নিজের ভাগ্য বদলাবে না, দেশের অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসবে। সম্মান ও অর্থ দুটোই মিলবে।
রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ‘মানব সম্পদ উন্নয়ন ও নিরাপদ অভিবাসন: প্রেক্ষিত সৌদি আরব’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা প্রশাসন ও রাজশাহী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) এ সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে ভবিষ্যৎ পেশা নিয়ে স্বপ্ন দেখা তরুণ-তরুণী, অভিভাবক এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতারের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার ফারজানা ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) টুকটুক তালুকদার, রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. যহুর আলী, নিউ গভঃ ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর কালাচাঁদ শীল এবং জেলা শিক্ষা অফিসার মো. আব্দুল ওয়াহাব। স্বাগত বক্তব্য দেন, রাজশাহী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী মো. নাজমূল হক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএমইটি’র অতিরিক্ত মহাপরিচালক আশরাফ হোসেন বলেন, অনেক বাংলাদেশি বিদেশে গিয়ে কাঙ্খিত বেতন পান না। অনেকে প্রতারণার শিকার হন, যার মূল কারণ অদক্ষতা। তিনি বলেন, একজন অদক্ষ কর্মী যে বেতন পান, একজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি উপার্জন করতে পারেন। আমরা চাই না আমাদের কর্মীরা বিদেশে গিয়ে সামান্য বেতনে মানবেতর জীবনযাপন করুক। সরকার সারা দেশে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে, যা দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ।
সেমিনারে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, এই মুহূর্তে জাপানে আমাদের জন্য একলাখ দক্ষ জনবলের একটি বিশাল কর্মবাজার অপেক্ষা করছে। এটি কোনো কল্পনা নয়, বাস্তবতা। তিনি জানান, জাপানি ভাষার এন-৪ স্তরের দক্ষতা অর্জন করতে পারলেই একজন বাংলাদেশি এই সুযোগ লুফে নিতে পারবেন। এই প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারিভাবে জাপানে যেতে খরচ হবে নামমাত্র, মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা। এর মধ্যে সাড়ে তিন হাজার টাকা কর্মীর সুরক্ষার জন্য কল্যাণ তহবিলেই জমা হবে। যেখানে বেসরকারিভাবে যেতে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়, সেখানে এটি একটি অভাবনীয় সুযোগ।
ঐতিহ্যবাহী শ্রমবাজার সৌদি আরবের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরব থেকে। এবছরও দেশটিতে ৪০ হাজার জনবল পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, গত এক বছরে দেশে ৩১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। তিনি আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য এই রেমিট্যান্স প্রবাহকে অচিরেই ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। আর এই স্বপ্ন পূরণের মূল চালিকাশক্তি হবেন আমাদের দক্ষ কর্মীরা।
নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা জানিয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, অভিবাসন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করতে একটি নতুন ইন্টিগ্রেটেড সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। আগামী পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনলাইনে ভর্তির রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে একজন কর্মী কোনো এজেন্সি বা দালালের সাহায্য ছাড়াই নিজের মোবাইল থেকে ভর্তির সকল তথ্য জানতে পারবেন, আবেদন করতে পারবেন এবং পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পন্ন করতে পারবেন। এটি অভিবাসন খাতে একটি বিপ্লব আনবে।
বিদেশ গমনেচ্ছুদের সতর্ক করে তিনি বলেন, জমি কেনার আগে মানুষ যেমন বারবার মেপে দেখে, দলিলপত্র যাচাই করে, তেমনি বিদেশ যাওয়ার আগেও সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন, কী কাজ, বেতন কত— সব জেনেবুঝে অগ্রসর হতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করতে হবে এবং যার কাছে টাকা দিচ্ছেন তার সঠিক পরিচয় ও ঠিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।