২৬ চৈত্র, ১৪৩২
০৯ এপ্রিল, ২০২৬

কেউ না জেতা যুদ্ধে নেতানিয়াহুর হার সবচেয়ে বড়

Admin Published: April 9, 2026, 6:22 pm
কেউ না জেতা যুদ্ধে নেতানিয়াহুর হার সবচেয়ে বড়

ডিএনএন ডেস্ক: যে যুদ্ধে কোনো পক্ষই জয়ী হতে পারেনি, সেখানে ‘ভঙ্গুর’ যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ হতে যাচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে। 


ইরানের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ বাঁধিয়ে জয়ী হওয়ার জন্য নেতানিয়াহু তাঁর আওতায় থাকা সব ধরনের চেষ্টাই করেছেন। বছরের পর বছর তেহরানের শাসক বদলের হুমকি দিয়েছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তাঁর কর্মকাণ্ডকে এখনো নাটকীয় বলা হয়। বিশ্ব মিডিয়ার সামনে তথাকথিত সব গোপন নথি তুলে ধরেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধে জড়াতে কূটনৈতিক চাপ দিয়েছেন। কিন্তু চলমান যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তাঁর সব চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।


শুরুতে নেতানিয়াহু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন- ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ও বিপ্লব ঘটবে। তখন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এটিকে ‘হাস্যকর’ বলে উল্লেখ করেছিল। শেষ পর্যন্ত তাই সত্য হলো। ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হয়নি। এমনকি দুইদিন আগেও ইসরায়েলি গণমাধ্যম চ্যানেল-১২ বলেছিল, যুদ্ধবিরতিতে রাজি না হতে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টকে চাপ দিচ্ছেন। সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পও নিজ থেকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন। কিছু সূত্র বলছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ট্রাম্প ইসরায়েলকে অনেকটাই পাশ কাটিয়ে গেছেন।


পাশ কাটানোর বিষয়টি ইসরায়েলের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদের কথাতেও উঠে এসেছে। এক্সে দেওয়া পোস্টে লাপিদ লিখেছেন, ইসরায়েলের পুরো ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক বিপর্যয় আগে ঘটেনি। তেল আবিবের জাতীয় নিরাপত্তার মূল বিষয়ে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, তখন ইসরায়েল আলোচনার টেবিলের ধারে কাছেও ছিল না।



লাপিদ আরও লিখেছেন, নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি নিজের নির্ধারিত কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেননি। নেতানিয়াহুর অহংকার, অবহেলা এবং কৌশলগত পরিকল্পনার অভাবে যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর সময় লাগবে।


বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলানও এই যুদ্ধবিরতিকে নেতানিয়াহুর ‘কৌশলগত ব্যর্থতা’ বলে অভিহিত করেছেন। এক্স পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘নেতানিয়াহু একটি ঐতিহাসিক বিজয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা ইসরায়েলের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ কৌশলগত ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছি। এটি একটি চরম ব্যর্থতা যা বহু বছর ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।’


বাস্তবতা হলো, নেতানিয়াহু তাঁর এই যুদ্ধ নিয়ে বাজি ধরেছিলেন। কিন্তু তিনি না পারলেন ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে, না পারলেন তেহরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দখল করতে। এমনকি ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোরও উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতিও করতে পারেননি। এর ফলে গাজায় গণহত্যার অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ ইসরায়েলের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি আরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


জনমত, কূটনীতিতে প্রভাব

এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শক্তি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ, বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুই সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে মাসব্যাপী যুদ্ধে লড়াই করা ও টিকে থাকার লক্ষ্য তারা অর্জন করেছে। যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে আইআরজিসি পুনরায় অস্ত্রসজ্জা ও ভবিষ্যতের হামলা মোকাবিলার সুযোগ পাবে। 



এমন অবস্থায় লেবাননে নেতানিয়াহুর হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণাকে অনেকটা দম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, নতুন ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে স্থল অভিযান চালানো ইসরায়েলি সেনাদের এখন হিজবুল্লাহকে মোকাবিলা করতে হবে। ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি নিজেদের ভূখণ্ডে যুদ্ধ করতে অনেক বেশি পারদর্শী। 


লেবাননে চালানো ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলা জনমত ও কূটনীতিতে আরও বেশি বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তেল আবিবের প্রতি আমেরিকানদের কয়েক দশকের যে রাজনৈতিক সমর্থন ছিল তা দৃশ্যত ভেঙে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে যুদ্ধে নামানোর ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর ভূমিকা মার্কিন কট্টর ডানপন্থী ও প্রগতিশীল উভয়পক্ষের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এমনকি ইহুদি ভোটারদের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।


অভ্যন্তরীণ চাপ

চলতি বছর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে যুদ্ধের ফলাফল নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন আনার ব্যাপারে জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধে তাঁর সেই লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জিত হয়নি।


ইরানকে এতদিন ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে প্রচার করেছে নেতানিয়াহু প্রশাসন। এখন মাসব্যাপী যুদ্ধের পরও সেই হুমকির কোনো পরিবর্তন হয়নি। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মারা গেলেও তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ছেলে মোজতবা খামেনি। যিনি আরও বেশি কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত। ইরানও পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অধিকার বজায় রাখার শর্তেই ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য করেছে


আপাতত, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার শর্তগুলো সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে হওয়া ‘আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তির’ কাঠামোর খুব কাছাকাছি বলে মনে হচ্ছে। নেতানিয়াহু ওই চুক্তি নস্যাৎ করতে দীর্ঘদিন চেষ্টা করেছেন। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সেই চেষ্টা সফল হয়, ওয়াশিংটন পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু এই প্রস্থান ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের মাথাব্যথার নিরাময় হতে পারেনি। 


সুযোগ আর আসবে না

ইসরায়েলের গণমাধ্যম হারেৎজের সামরিক সংবাদদাতা আমোস হারেলের মতে, নেতানিয়াহুর অধীনে বর্তমান প্রশাসনের অনেক দুর্বলতা সামনে এসেছে। সেগুলো হলো- কল্পনার ওপর ভিত্তি করে বাজি ধরার প্রবণতা, অপরিপক্ব পরিকল্পনা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের প্রতি অবজ্ঞা।


একটি বিষয় ইসরায়েলিদের কাছেও স্পষ্ট হয়েছে। সেটি হলো- যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন পেয়ে মাসব্যাপী অভিযান চালানোর মতো সুযোগ নিকট ভবিষ্যতে আর আসবে না। সামনের দিনগুলোতে ছোটখাটো সংঘর্ষ হলেও পুনরায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা ক্ষীণ। 


এরইমধ্যে যুদ্ধের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যার প্রধান কারণ অর্থনীতির ওপর পড়া ক্ষতিকর প্রভাব। তাই অনেকেই বলছেন, ভবিষ্যতে সংঘাতে জড়ানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে পাওয়ার সুযোগও হারিয়েছেন নেতানিয়াহু।


আমোস হারেল লিখেছেন, এ নিয়ে টানা চতুর্থবার এমনটা হলো। গত কয়েক বছরে গাজায়, লেবানন এবং ইরানে দুইবার হামলা করেছে ইসরায়েল। প্রতিবারই ‘চূড়ান্ত বিজয়’ এবং ‘অস্তিত্বের হুমকি নির্মূলের’ কথা ঘোষণা করা হয়েছে। সেই আস্ফালনগুলো এবারও ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে।