কৃষিবিদ মনিরুজ্জামান বাবুল : 'এ পৃথিবীর যত সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর'—কাজী নজরুল ইসলামের এই চিরন্তন পংক্তি মানব জাতীর মুলত শেকড় থেকে শিখরে উন্নীত হবার যে স্বীকৃতি, ত্রিরুপের মানবী কন্যা-জায়া-জননীর জন্য এখানে তা উৎসর্গীত হয়েছে ! ১১ অক্টোবর, বিশ্ব শিশু কন্যা দিবস, এবারের প্রতিপাদ্য "আমি কন্যা শিশু- স্বপ্নে গড়ি, সাহসে লড়ি, দেশের কল্যাণে কাজ করি"। প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য হলো কন্যাশিশুদেরকে আত্মমর্যাদা, দক্ষতা, সাহস এবং নেতৃত্বের জন্য উদ্বুদ্ধ করা।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুগে যুগে দার্শনিক, রাজা, কবি ও চিন্তাবিদেরা কন্যার মর্যাদা নিয়ে অনন্য ভাব প্রকাশ করেছেন।
গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন “কন্যাকে এমন শিক্ষা দাও, যাতে সে নিজেকে কখনো দুর্বল না ভাবে। আর মহান সেনাপতি আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বলেছিলেন— “যে জাতি তার কন্যাকে সম্মান দেয়, সে জাতি কখনো পরাজিত হয় না।
মাটি থেকে মহাকাশ,
ঘর থেকে সিংহাসনে কন্যা দের আজ আধিপত্য। প্রযুক্তি, শিল্প, চিকিৎসা সেবা উন্নয়ন এমনকি খেলার মাঠ থেকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে সর্বক্ষেত্রে নারী যোগ্যতার সাক্ষর রেখে চলেছে !
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে গত সপ্তহে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধি রুবাবা দৌলা, যার জয়জয়কারে মিডিয়া হাউজ আজ সরব। একাডেমিক ক্যারিয়ার থেকে কর্পোরেট সহ বিভিন্ন অঙ্গনে যোগ্যতার সুস্পষ্ট নজির রেখেছেন এই স্মার্ট নারী। কন্যা দিবসে এরুপ কাউকে আইডল মানা অভিভাবক দের স্বপ্নের দুয়ার খুলেছেন তিনি।
মুসলিম মহাকাশচারী আনুশেহ আনসারী, বিখ্যাত প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদ হিসা আল জাবির ইমরান বিন্দো, মাদাম কুরী, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এরুপ অসংখ্য উদাহরণ, বিশ্বজুড়ে কন্যা সন্তানদের গুরুত্ব মর্যাদা ও সভ্যতার দিশারী হিসেবে নক্ষত্র স্বরুপ!
প্রতি দশকে নারী শিক্ষার হার ক্রমাগত ইতিহাসে রুপ নিয়েছে!
দেশে মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৩শতাংশ নারী, এছাড়া অন্য এক জরিপে দেখা গেছে পেশাগত শিক্ষায় ৬১ শতাংশ নারী।
সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষায় নারী শিক্ষার্থী রা এগিয়ে, তাদের পাশের হার ৭১.০৩%।
সিরিমাভো বন্দরনায়েকে কিবা ইসাবেলা পেরন প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি পদে বিশ্বে প্রথম মহিলা অঙ্গনকে যোগ্যতার মানদণ্ডে স্থায়ী করেছেন,পরবর্তীতে মুসলিম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো, বিরাট গনতান্ত্রিক দেশ ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি ধ্রুপদী মূর্মু প্রভুত উদাহরণ কন্যা দিবসের গুরুত্বকে মহিমান্বিত করবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।
বর্তমানে রাজশাহীতে কর্মরত প্রথম মহিলা
জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার ও
এসপি হিসেবে ফারজানা ইসলাম ফোকাস পয়েন্টে গুরু দায়িত্ব পালন করছেন যার দুইজনি নারী, যা এই শিক্ষা নগরীতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত !
আমাদের উপমহাদেশের প্রেরণাদায়ী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত, ছিলো দেশের অন্ধকারের বাতি! আর স্ফুলিঙ্গ কন্যা
মালালা ইউসুফ তো নবযাত্রায়
মানবসভ্যতাকেই আলোকিত করার এক অদম্য বিশ্বাস।
ইসলাম কন্যাশিশুর মর্যাদাকে দিয়েছে সর্বোচ্চ স্থান। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন—“যে ব্যক্তি দুই কন্যাকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কণ্যাদের সাথে সদব্যবহার করবে কিয়ামতের দিন সে আমার সঙ্গে থাকবে।” (সহিহ মুসলিম)
এই বাণীগুলো শুধু ধর্মীয় অনুপ্রেরণা নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের পরম বার্তা—যেখানে কন্যা সন্তানকে দেখা হয়েছে আল্লাহর বিশেষ দান ও আশীর্বাদ হিসেবে।
এসব বাণী আমাদের শেখায়—কন্যা মানেই সম্ভাবনা, কন্যা মানেই সাহস ও আলোকিত ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি!
বাংলাদেশে কন্যাশিক্ষা ও নারী উন্নয়ন অনেক এগিয়েছে—আজ মেয়েরা শিক্ষায়, কর্মক্ষেত্রে, নেতৃত্বে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে।
তবু সমাজের কিছু প্রতিবন্ধকতা যেমন বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি, সাইবার নিপীড়ন ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি দূর হলে কন্যার স্বপ্নের পথে তেমন আর বাধা থাকবেনা! পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—মিলে আসন্ন নির্বাচনের অঙ্গীকারে নিয়ে প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ সুনিশ্চিত করতে হবে।
একটি কন্যা শিশু সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। সে একদিন হবে মা, শিক্ষক, কবি, বিজ্ঞানী কিংবা নেতৃত্বদানকারী নারী।
তাকে অবহেলা করা মানে সমাজের অর্ধেক আলো নিভিয়ে দেওয়া।
তাই প্রয়োজন পরিবারে সমতা, শিক্ষায় সুযোগ এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার দৃঢ় নিশ্চয়তা।
এই তিন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠবে এক ন্যায়নিষ্ঠ ও মানবিক সমাজ।
বিশ্ব কন্যা দিবস কেবল উদ্যাপনের দিন নয়, এটি আত্মসমালোচনার মুহূর্ত—
আমরা কি সত্যিই কন্যাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিচ্ছি?
একটি কন্যার হাসি মানে এক জাতির আশার আলো, একটি কন্যার শিক্ষা মানে এক প্রজন্মের অগ্রগতি,একটি কন্যার মর্যাদা মানে এক সভ্যতার স্থিতি।
"কোনো কালে একা,
হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি,
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি যুগায়াছে, বিজয়-লক্ষ্মী নারী!!"
প্রেরণার উৎস
কন্যা, জয়া, জননী—এই তিন রূপেই নারী ছিলো আছে এবং থাকবে।
জীবনের চিরন্তন সৌন্দর্য, সৃষ্টির উৎস, প্রেরণার অহংকার এবং মানবতার অর্ধেক আলো দাবীদার এই নারী কমিউনিটি।
তাঁদের হাতেই ভবিষ্যতের পৃথিবী হবে আরও সুন্দর, আরও ন্যায়নিষ্ঠ ও আরও আলোকিত।
লেখক: গবেষক ও এক্টিভিষ্ট, কমিউনিটি কেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও উদ্যোক্তা মমতা নার্সিং ইনস্টিটিউট