১৮ বৈশাখ, ১৪৩৩
০১ মে, ২০২৬

কর্মধিকার হোক আন্তর্জাতিক শ্রমদিবসে অন্যতম অঙ্গিকার

কর্মধিকার হোক আন্তর্জাতিক শ্রমদিবসে অন্যতম অঙ্গিকার

আজ পহেলা মে, মহান মে দিবস। কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদা—মে দিবসে শ্রম অধিকারের নতুন ত্রিমাত্রিক ভাবনা শ্রম অধিকারের এক নতুন সমীকরণ। আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে বৈশ্বিক অঙ্গীকারের প্রতীক। ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে-মার্কেট আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে সংগ্রামের সূচনা, তার মূল লক্ষ্য ছিল মানবিক কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও সীমিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা। তবে বর্তমান বাস্তবতায় শ্রম অধিকারের ধারণা আরও বিস্তৃত হয়ে কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রম অধিকারের পূর্বশর্ত হিসেবে “কর্ম অধিকার”—অর্থাৎ কাজ পাওয়ার সুযোগ—আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করলেও  সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বেকারত্ব ও আংশিক বেকারত্ব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। কাজের সুযোগ না থাকলে শ্রম অধিকার বাস্তবে অর্থহীন হয়ে পড়ে।


তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে কাজের মান ও পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। এছাড়া সকল কাজ বিশেষত উৎপাদনের সাথে জড়িত যেমন কৃষি ও কৃষিজাত দ্রব্য সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের মর্যাদা আজ অন্যান্য চটকদারী ও  সস্তা জনপ্রিয় শ্রমিকদের মর্যাদা থেকে পিছিয়ে,  কর্মঘণ্টা পারিশ্রমিক কর্মপরিবেশ কর্মমূল্যায়ন ইত্যাদি বিবেচনায় কৃষি শ্রমিকদের অগ্রাধিকারের বিষয়টি অগ্রগন্য হওয়া জরুরি। পুলিশ বা ব্যাটেলিয়ন সার্ভিস গুলোর শ্রমগুলো পূনমুল্যায়ন বিবেচনা ভুক্ত হওয়া উচিত। 


এছাড়া সরাসরি জীবন বাঁচাতে  সেবামুলক কাজে অংশ নেয়া সকল শ্রেনী পেশার বিশেষত স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের মুল্যায়ন শুধু কর্মঘণ্টা বা পারিশ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটা ভাবার সময় এসেছে। 


সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক নার্সের সঙ্গে রোগীর স্বজনের অসদাচরণের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কর্মক্ষেত্রে সম্মান ও নিরাপত্তার অভাব শ্রম অধিকারের পরিপন্থী। একজন কর্মী যদি তার কাজের যথাযথ স্বীকৃতি ও সামাজিক মর্যাদা না পান, তবে তার শ্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না।

শিখন , প্রশিক্ষনব এবং দক্ষতা উন্নয়নে নিবেদিত শিক্ষক প্রশিক্ষকদের শ্রম অধিকারকে অগ্রগামী করতে কী কী করনীয় তা ভাবনায় আনা জরুরি। 

এই প্রেক্ষাপটে “মূল্যায়নের অধিকার” একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির পাশাপাশি তার কাজের স্বীকৃতি, সম্মান ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। শ্রম অধিকার, কর্ম অধিকার এবং মূল্যায়নের অধিকার—এই তিনটি একে অপরের পরিপূরক।


অন্যদিকে, একই কাজের জন্য ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে ভিন্ন পারিশ্রমিকের বিষয়টি আজও বাস্তবতা। ঢাকায় একটি নির্দিষ্ট পদে কর্মরত ব্যক্তি যে বেতন পান, অন্য শহরে একই কাজ করেও অনেকেই কম পারিশ্রমিক পান। আন্তর্জাতিক কারেন্সিতে  ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রেও ভৌগোলিক পরিচয়ের কারণে আয় বৈষম্য দেখা যায়। দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে একটি মানসম্মত পারিশ্রমিক কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।


আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার “শোভন কাজ” ধারণা অনুযায়ী, কর্মসংস্থান, শ্রম অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা—এই চারটি স্তম্ভ একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের জন্যও এটি প্রাসঙ্গিক। শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রম আইন কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ শ্রমব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।


সবশেষে বলা যায়, মে দিবসের চেতনা আজ নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুধু শ্রম অধিকার নয়, কর্মসংস্থান এবং কাজের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে এই তিনটির সমন্বয় অপরিহার্য।