মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ঢালাওভাবে কথা না বলার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সোমবার (২৯ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তাঁর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন।
মন্ত্রিসভার অনির্ধারিত আলোচনায় গতকাল কোটা সংস্কার আন্দোলনের চলমান পরিস্থিতি স্থান পেয়েছে। এ নিয়ে মন্ত্র্রীদের সঙ্গে পৃথক আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শুরুতে বৈঠকে উপস্থিত সব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হয়। এরপর জ্যেষ্ঠ কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।বৈঠকে উপস্থিত একাধিক মন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নিজ নিজ দপ্তর নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে বলেছেন। নিজ দপ্তরের বাইরে ঢালাওভাবে কথা না বলারও নির্দেশ দিয়েছেন।
এ ছাড়া ছাত্রদের প্রতি নমনীয় আচরণ করতে বলা হয়েছে। তবে ছাত্রদের ব্যানারে ঢুকে কেউ সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও করতে বলা হয়েছে।বৈঠক শেষে চলমান পরিস্থিতির বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে, তাতে এখনই খোলার কোনো সুযোগ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জানালা-দরজা যেভাবে ভাঙা হয়েছে, তাতে আগামী ছয় মাসেও ক্লাস করা সম্ভব কি না, সেটা দেখে এসে বলেন। এগুলো মেরামত করতেও তো সময় লাগবে। এ ছাড়া অন্য কোনো প্রসঙ্গে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কথা হয়নি।মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল চলমান পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে তিনি সহিংসতার সার্বিক বিষয় তুলে ধরেন।
সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িতদের বিষয়েও ধারণা দেওয়া হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তাদের খুঁজে বের করে গ্রেপ্তারের কথাও বলেন। সরকার থেকে গত রবিবার পর্যন্ত ১৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে আরো তিনজনকে যুক্ত করায় মোট সংখ্যা এখন ১৫০।এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বৈঠক শেষে কালের কণ্ঠকে বলেন, চলমান কারফিউর বিষয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এসংক্রান্ত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কোনো নির্দেশনাও দেননি। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
নিহতদের স্মরণে আজ দেশব্যাপী শোক
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আজ মঙ্গলবার দেশব্যাপী শোক পালন করবে সরকার। শোক পালনের অংশ হিসেবে কালো ব্যাজ ধারণ করা হবে। মসজিদে দোয়া মাহফিল এবং মন্দির-গির্জা-প্যাগোডায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে। সরকারি-বেসরকারি সব নাগরিক এই কর্মসূচি পালন করতে পারবে। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। পরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব মো. মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বৈঠকের এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান।
মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। বৈঠকে কোটা আন্দোলন নিয়ে যে পরিস্থিতি হয়েছিল, সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। পরে এ নিয়ে আলোচনা হয়। সেই আলোচনার ভিত্তিতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় এবং আগামীকাল (আজ) দেশব্যাপী শোক পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি সব নাগরিক এই কর্মসূচি পালন করতে পারবে। তবে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার ৬৫%
চলতি বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল থেকে জুন) মন্ত্রিসভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার ৬৫ শতাংশ। মন্ত্রিসভা বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে ২০২৪ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক (এপ্রিল-জুন) প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সাতটি মন্ত্রিসভা বৈঠক হয়। এতে ৬০টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে ৩৯টি। সে অনুযায়ী এই হার ৬৫ শতাংশ। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মন্ত্রিসভা বৈঠকে চারটি নীতি বা কর্মকৌশল, ৯টি চুক্তি বা প্রটোকল অনুমোদিত হয়েছে এবং সংসদে চারটি আইন পাস হয়েছে।
মাহবুব হোসেন বলেন, ‘২০০০ সালে শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তিনি একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন, ব্রিটিশ আমলে যেসব আইন করা হয়েছিল সেগুলো যেন পর্যায়ক্রমে আমরা বাংলায় রূপান্তর করি। যেসব আইনের প্রয়োজন নেই, সেই আইনগুলো যেন আমরা বাতিল করি। পরে ২০১৫ সালে তিনি আবার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে দ্বিতীয় সভায় এ রকম একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। নির্দেশনা পাওয়ার পর আমরা সিরিয়াসলি এটি নিয়ে এনগেজ হই। আমরা ২৪৪টি আইন চিহ্নিত করি, যেগুলো ব্রিটিশ আমলে করা হয়েছিল। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এর মধ্যে ২৫টি বাতিল করা হয়েছে। ১৯৯টির আসলে কিছুই হয়নি। কোনটি কোন মন্ত্রণালয় করবে, এটি নিয়ে একটা অস্পষ্টতা ছিল। এবার মন্ত্রিসভা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা লেজিসলেটিভের মাধ্যমে এগুলো এক্সারসাইজ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে ভাগ করে দেব, যাতে দ্রুত কাজটি শেষ হয়।’