ডিএনএন ডেস্ক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক কর্তৃক এক নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি ও নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে ১১ দফা দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে আয়োজিত মানববন্ধনে তারা এ দাবি জানান। পরে ১১ দফা দাবি নিয়ে উপাচার্য সালেহ হাসান নকীব বরাবর একটি স্মারকলিপি দেন।
দাবিগুলো হলো- ভুক্তভোগীর সার্বিক নিরাপত্তা ও শারীরিক-মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গোপনীয়তার সাথে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা ও সংরক্ষণ করা, নির্যাতনকারী যেন প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দায় এড়িয়ে যেতে না পারে সে জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে বিভাগ থেকে স্থায়ী বহিষ্কার ও প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া।
নিরাপদ ক্যাম্পাসের জন্য শিক্ষার্থীদের অন্য দাবিগুলো হলো- কোন শিক্ষকের অতীত আচরণ যাচাই করে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তির আওতায় আনা, প্রতিটি বিভাগে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সেলের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা, শিক্ষক নিয়োগে প্রার্থীর অতীত রেকর্ড যাচাই, মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন ও লিখিত অঙ্গীকারনামা বাধ্যতামূলক করা, ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার খরচ প্রশাসন বহন করা, সাজেশন বা অন্যান্য কারণে নারী শিক্ষার্থীদের চেম্বারে ডাকা বন্ধ করা, প্রয়োজনে চেম্বারে ডাকলে খোলা দরজা নীতি অনুসরণ করা, শিক্ষকদের চেম্বার সিসিটিভির আওতায় আনা এবং প্রতিটি বিভাগে স্বাধীন মনিটরিং সেল গঠন করা।
মানববন্ধনে পরিসংখ্যান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাফিসা নেহা বলেন,“আমাদের বিভাগে একজন শিক্ষকের হাতে যৌন হয়রানি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটি শুধু আমাদের বিভাগ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো জায়গাতেই কাম্য নয়। শিক্ষক আমাদের পিতৃতুল্য। আমরা তাদের ওপর ভরসা করে এখানে পড়তে আসি। অথচ একজন শিক্ষকই যদি এমন আচরণ করেন, তাহলে আমরা কোথায় নিরাপদ?”
তিনি আরও বলেন,“আমরা শুধু ঘটনার শিরোনাম দেখি, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখি না। আমরা চাই, এ ঘটনার এমন শাস্তি হোক যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সাথে এমন আচরণ করার সাহস না পান।”
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও স্টুডেন্টস রাইটস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফাহির আমিন বলেন,“এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্যই নিরীহ শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারাই নারী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করেন, তাহলে ভাইয়েরা কিভাবে বাড়িতে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন?”
একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “আমি সেই একাডেমিক কাউন্সিলকে ঘৃণা করি যারা একজন নিপীড়ক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। সেই সিন্ডিকেটকে প্রত্যাখ্যান করি যারা একজন যৌন নিপীড়ককে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে ব্যর্থ হয়। আমরা চাই আইনগতভাবে এর সুষ্ঠু বিচার হোক। তা না হলে আমরা বাধ্য হবো আইন ভাঙতে। আমরা রাজপথে নেমেছি, প্রহসনমূলক বিচার মেনে ঘরে ফিরব না।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ফরিদ খান বলেন,“ আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। গতকাল পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক প্রতিনিধি দল আমাদের সাথে কথা বলেছে। আজ শিক্ষার্থীদের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। এবিষয়ে আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলে আমরা অভিযুক্ত শিক্ষকের ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”
এর আগে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. প্রভাস কুমার কর্মকারের বিরুদ্ধে এক নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠে। ১৩ আগস্ট ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মা পরিসংখ্যান বিভাগের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগে বলা হয়, ৪ আগস্ট মাস্টার্সের ওই শিক্ষার্থী ক্লাসের উপস্থিতি সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে অধ্যাপক প্রভাস কুমার কর্মকারের চেম্বারে গেলে তিনি ‘সাজেশন’ লেখার কথা বলে কাগজ দেন। শিক্ষার্থী লিখতে থাকা অবস্থায় ওই শিক্ষক তার শরীরে অশোভন স্পর্শ করেন এবং কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দেন।
এঘটনায় পরিসংখ্যান বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেয়। মানববন্ধনে বিভিন্ন বিভাগের শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন।