স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীতে ধর্ষণের শিকার ১২ বছরের শিশু মা হয়েছেন। প্রায় দুই বছর আগে মা হলেও নবজাতকের বাবা হিসেবে শিশুটির মামাকে দায়ি করা হয়। পরে তার সঙ্গে ওই শিশুর বিয়েও দেওয়া হয়। নানিবাড়িতে থাকার সময় মামার কাছে প্রায়ই ধর্ষণের শিকার হতো মেয়েটি। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা যায়, সন্তানের বাবা কিশোরীর মামা নয়। অধিকতর তদন্তের পর পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, সৎবাবার ধর্ষণের ফলে মা হয়েছে ওই কিশোরী। ইতিমধ্যে সৎবাবাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটেছে রাজশাহীর চারঘাটের। অভিযুক্ত সৎবাবা চারঘাট উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। সৎবাবার কাছে ধর্ষণের শিকার হওয়ার সময় মেয়েটির বয়স ছিল ১২ বছর। এখন তার পুত্রসন্তানের বয়স ১ বছর ৯ মাস। মামার ধর্ষণের কারণে মেয়েটি গর্ভবতী হয়েছে ধারণা করে গ্রামের লোকেরা তাঁর সঙ্গে মেয়েটির বিয়েও দিয়েছেন।
তবে ঘটনার রহস্য বেরিয়ে এসেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে। পিবিআই বলছে, সৎবাবার কাছে ধর্ষণের শিকার হয়ে মেয়েটি গর্ভবতী হলেও সে তার মামার মাধ্যমেও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাই দুজনের বিরুদ্ধেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রবিবার রাজশাহী পিবিআইয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২০২১-২২ সালে ওই কিশোরী রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় তার নানাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত। সেখানে সে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। পরে সে জানায়, ২০২১-২২ সাল পর্যন্ত নানাবাড়িতে থাকাকালে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে মামা তাকে দিনের পরে দিন ধর্ষণ করে।
ঘটনাটি জানাজানি হলে ২০২২ সালের ২২ নভেম্বর এলাকার লোকজন ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ৭ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে মামার সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে দেয়। এ বিয়ে মানতে না পেরে মেয়েটি আত্মগোপন করে। পরবর্তী সময়ে মেয়ের মা তাকে রাজশাহী শহরের ভাড়া বাসায় নিয়ে আসেন। এরপর ২০২৩ সালের ৩ মার্চ মেয়েটি এক পুত্রসন্তান প্রসব করে।
এরপর ভুক্তভোগী মেয়ের মা বাদী হয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল মামলা করেন। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। তারা আসামিকে ঢাকার কামরাঙ্গীরচর থেকে গ্রেপ্তার করে। এরপর আদালতের আদেশে ওই কিশোরী, তার সন্তান ও আসামির ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু দেখা যায়, আসামির সঙ্গে নবজাতকের ডিএনএ মিলছে না।
পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে অধিকতর তদন্ত শুরু করে পিবিআই। এরপর তারা জানতে পারে, মেয়েটির মা ২০২০ সালে তাঁর দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে রাজশাহী শহরে ভাড়া থাকতেন। ২০২২ সালের রমজান মাসের শেষ সপ্তাহে তাঁর মেয়ে মায়ের সঙ্গে ঈদ করতে এসে প্রায় দুই মাস থাকে। মেয়েটি রাতে একই ঘরে ঘুমাত। আর তার মা ও সৎবাবা ঘুমাত মেঝেতে। সেখানেই ধর্ষণের শিকার হয় সে। এরপর সৎবাবার ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে নবজাতকের ডিএনএর সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজশাহী পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন জানান, মামার সঙ্গে ডিএনএ না মিললে মেয়েটির সঙ্গে তিনি আবার কথা বলেন। সে কোথায় কোথায় ছিল তা জানার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে সে জানায়, সে মায়ের বাড়ি এসে ২ মাস থেকেছে। তখন তিনি সৎবাবাকে সন্দেহ করেন। কিন্তু মেয়েটি জানায়, ঘুমের মধ্যে কিছু হয়েছে কি না, তা তার মনে নেই। পরবর্তী সময়ে ডিএনএ পরীক্ষা করে তাঁরা নিশ্চিত হন।
পিবিআইয়ের পরিদর্শক জানান, ২১ জানুয়ারি অভিযুক্ত সৎবাবাকে রাজশাহী নগরের মুক্তমঞ্চ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে সব স্বীকার করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এরপর আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তা আরও জানান, মেয়েটি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে, তার মামা তাকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছে। আবার সৎবাবাও অপরাধ স্বীকার করেছেন। সৎবাবার ধর্ষণের কারণে মেয়েটি গর্ভবতী হলেও তার মামাও একই কাজ করেছেন। বর্তমানে তার মামা জামিনে আছেন। আর সৎবাবা মেহেদী কারাগারে।