ডিএনএন ডেস্ক: ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই ভেঙে পড়ে। এমনই এক চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকার শুরু করে রাষ্ট্র সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুনরুদ্ধারের কাজ।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। ইতোমধ্যে এই সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হচ্ছে। তারাও পুলিশ বাহিনীটি সংস্কারে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মনে করছে,এরপরও কোনো সংস্কার কাজে আসছে না পুলিশ বাহিনীর। নিজেদের ওপর অর্পিত ক্ষমতার প্রয়োগও পুরোপুরি করতে পারছেন না পুলিশ কর্মকর্তরা। বাধ্যতামূলক অবসর, পদোন্নতি, শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির, মেধাবী কিংবা যোগ্যতা সম্পন্নদের যথাযথ পদায়ন না করায় ঘুরে দাড়াতে পুলিশকে বেগ পেতে হচ্ছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, প্রায় দুই শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান সরকারের সময় চাকরির বয়স ২৫ বছর এবং সরকারি চাকরি বিধি মালার নিয়ম মেনে বিভিন্ন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পুলিশের অনেক কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় জেলার পুলিশ সুপারের (এসপি) দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৩ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। বাকিদেরও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে সাতজন এএসপি ও ৪৯ জন পুলিশ পরিদর্শককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী তাদের চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় ‘জনস্বার্থে’ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে। চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া আরো পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে। এ তালিকায় ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বহুল আলোচিত ‘রাতের ভোট’-এ দায়িত্ব পালনকারী ওসিরা রয়েছেন বলে জানা গেছে।
আবার রাতের ভোটের সময় জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার কারণে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর তালিকায় আরো পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। এই তালিকায় পুলিশ পরিদর্শক থেকে শুরু করে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো পরিদর্শকের তালিকায় রয়েছেন- এসএ মাসুদ পারভেজ, শেখ মো. গোলাম মোস্তফা, মো. মোস্তফা কামাল হায়দার, শাহ মো. হারুন অর রশীদ, খায়রুল ফজল, মো. ইসমাইল হোসেন, মো. এমদাদুল হক, সমীর চন্দ্র সূত্র ধর, মো. আখতারুজ্জামান প্রধান, মো. নান্নু মোল্লা এবং মো. জাকির রব্বানী।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করা পুলিশ পরিদর্শকারা ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা জেলার পুলিশ সুপারদের নির্দেশে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের রাতের ভোটের অপকর্মের সমন্বয় করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গণঅভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ১৩৭ জন পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। পর্যায়ক্রমে তাদের মধ্যে ৮০ জন কর্মস্থলে ফিরেছেন। ৫৭ জন এখনো পলাতক। পলাতকদের মধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এএসপি, পরিদর্শক, এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল আছেন। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই পুলিশের ১৭ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ৫৬ জন এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর আরো ৮৫ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে হওয়া মামলায় এখন পর্যন্ত ৬৮ জন পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন।
কারাগারে থাকা পুলিশের ৬৮ সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন- সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ইকবাল বাহার, গাজীপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. সাইফুল ইসলামসহ অন্যরা। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাও বর্তমানে কারাগারে আছেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে পুলিশ সংস্কারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ কাজে আসছে না। নিজেদের ওপর অর্পিত ক্ষমতার প্রয়োগ করতে পারছেন না পুলিশ কর্মকর্তরা। এসব কারণে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বাহিনীটি। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মাঠ পযায়ের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে। পুলিশ বাহিনীকে পেশাদার, গতিশীল ও জনমুখী হিসাবে গড়ে তুলতে হলে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা বঞ্চিত হওয়ার কার্ড খেলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কাজের সঠিক পারফরম্যান্স, সততা ও মাঠপর্যায়ের যোগ্যতাই মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ডে করতে হবে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যারা নানা কারণে কোণঠাসা ছিলেন, তারা নিজেদের ‘বঞ্চিত’ দাবি করে ইতোমধ্যে কয়েক ধাপে পদোন্নতি ও সুবিধাজনক পদায়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। বাস্তবে তারা কোন প্রেক্ষাপটে বঞ্চিত ছিলেন এবং বর্তমানে তাদের পারফরম্যান্স কেমন- তার কোনো সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ হচ্ছে না।
সূত্র জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেঙে পড়া কাঠামো পুনর্গঠনে ১৩ অক্টোবর উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে। যেখান থেকে বাহিনীতে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের নির্দেশনা আসতে পারে। নিয়োগ, বদলি এবং পদায়নেও আসতে পারে নতুন নির্দেশনা। শুধু কনস্টেবল এবং এএসপি ছাড়া অন্যান্য পদে সরাসরি নিয়োগ না দেওয়ার প্রস্তাব আসতে পারে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় চাকরিরত কনস্টেবলদেরও গ্র্যাজুয়েশনের আওতায় আনার পরিকল্পনা আছে। এ ক্ষেত্রে এসআই হিসাবে পদোন্নতি পাওয়ার পরই তাদের পাঠানো হবে একাডেমিতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, সংকটময় পরিস্থিতিতে পুলিশ পুনর্গঠনে কার কী অবদান ছিল তার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা জরুরি। নতুন পরিস্থিতিতে পুলিশ যখন মনোবল হারিয়ে ভেঙে পড়েছিল, তখন এক শ্রেণির কর্মকর্তা বাহিনী পুনর্গঠনে কাজ না করে বিভিন্ন দপ্তর ও দরবারে তদবিরে ব্যস্ত ছিলেন। আবার ডিবি, এসবি ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এখনো সাবেক বিতর্কিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিশ্বস্ত অনুসারীরা অবস্থান করছেন। তারা পুরো বাহিনীর চেইন অব কমান্ড বিনষ্টের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উসকানি দিচ্ছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, “পুলিশ সদস্যদের মূল্যায়ন ও পদায়নে যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত সততাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।”