৭ ভাদ্র, ১৪৩৩
২২ আগস্ট, ২০২৬

ইরানে সরকার পতনের ডাক দেওয়া কে এই ‘রাজপুত্র’

Admin Published: January 9, 2026, 9:45 pm
ইরানে সরকার পতনের ডাক দেওয়া কে এই ‘রাজপুত্র’

ডিএনএন ডেস্ক: ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিক্ষোভ এখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আন্দোলনকে এমন মাত্রা দিতে আহ্বান জানিয়েছেন খোদ ইরানের ক্ষমতাচ্যুত রাজবংশের এক স্বঘোষিত রাজপুত্র। নাম- রেজা পাহলভি। বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, রেজা পাহলভির ডাকে বৃহস্পতিবার কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। আরেক গণমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের দাবি, এই সংখ্যা ছিল লাখের মতো। তীব্র আন্দোলনের মুখে বৃহস্পতিবারই দেশজুড়ে ইন্টারনেট শাটডাউন করে বর্তমান শাসকরা।


রেজা পাহলভি হলেন ইরানের শাহ রাজপরিবারের সদস্য যাদের পতন হয় ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ছিলেন রাজপরিবারের শেষ শাসক। পারিবারিক শাসনের পতনের পর রেজা পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। অভিযোগ আছে, তিনি ইসরায়েল ঘনিষ্ঠ।


ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নেয়ার ইস্ট পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো হলি ড্যাগ্রেস বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, পাহলভির আহ্বান বিক্ষোভের গতিপথ বদলে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করার লক্ষ্যে বিক্ষোভে নামার আহ্বান ইরানিরা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে।


পাহলভির ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা 

বার্তা সংস্থা ওয়েস্ট এশিয়া নিউজ এজেন্সি (ডব্লিউএএনএ) ইসরায়েলি একটি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার বলছে, রেজা পাহলভি সম্প্রতি ‘নর্দার্ন ওয়েস্ট ব্যাংক সেটেলমেন্টস কাউন্সিল’- এর প্রধান ইয়োসি দাগানের সঙ্গে দেখা করেছেন।


ইসরায়েলের ‘চ্যানেল ফোরটিন’ এক্স-এ ওই বৈঠকের ছবি প্রকাশ করেছে। যেখানে ইসরায়েলের ডানপন্থি শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত দাগানকে পাহলভির পাশে দেখা যায়। যদিও আলোচনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানে সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই বৈঠককে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে ইরানের বর্তমান শাসকরা অভিযোগ তুলেছেন, বিদেশ থেকে ইরানকে অস্থির করার চেষ্টা চলছে। বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।


কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, রেজা পাহলভি এর আগেও ইসরায়েল সফর করেছেন। সেটি ছিল ২০২৩ সালের ঘটনা। ওই সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও বৈঠক করেন। নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ইরানের প্রবক্তা হিসেবে পরিচয় দেওয়া পাহলভি ওই সফরের সময় বলেছিলেন, এটির উদ্দেশ্য ছিল একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা। কারণ তিনি চান ইসরায়েলের মানুষ জানুক যে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানি জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না।


রেজা পাহলভির ওই সফরকে চরম-ডানপন্থি ইসরায়েলি সরকার উল্লেখ করেছিল, ‘সবচেয়ে প্রভাবশালী ইরানির ইসরায়েল’ সফর হিসেবে। চলমান বিক্ষোভের সময়ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ জনগণকে আন্দোলনে সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছে। যেটির উদাহরণ দিয়ে ইরানি গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকে তুলে ধরছে ‘পরিচালিত অস্থিতিশীলতা’ হিসেবে। 


ট্রাম্পের দৃষ্টিতে পাহলভি

শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বিক্ষোভকে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি শত্রুদের ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর এই ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে একটি পডকাস্টে অংশ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে তিনি ইরানের বিক্ষোভের পাশাপাশি রেজা পাহলভিকে নিয়ে মন্তব্য করেন।



মার্কিন প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিতে রেজা পাহলভি ‘অত্যন্ত ভদ্র লোক’। তবে সম্ভাব্য নতুন ইরানের শাসক হিসেবে তিনি পাহলভিকে এগিয়ে রাখার পক্ষে না। ‘দ্য হিউ হিউইট শো’ নামের পডকাস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, বিষয়টি উন্মুক্ত থাকা উচিত। দেখা যাক কে সামনে উঠে আসে। 


আলজাজিরা লিখেছে, ট্রাম্পের মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, বর্তমান ব্যবস্থার ধ্বংস হলে ইরানে ‘পরিবর্তনশীল শাসন পরিচালনার’ প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও পাহলভিকে সমর্থন দেয়নি।


‘ট্রাম্পের বাসনা সহজে পূরণ হবে না’

ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয় গত ২৮ ডিসেম্বর। এর কয়েকদিন পর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম দফায় তেহরানের শাসকদের হুমকি দেন। বলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধারে যেতে প্রস্তুত আছে। ট্রাম্প সেদিন ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছিলেন। সাধারণত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত অর্থে এটি ব্যবহার করা হয়।


দ্বিতীয় দফায় গত বৃহস্পতিবারও তিনি ইরানের শাসকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা শুরু হয় তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে খুব কঠোরভাবে আঘাত হানবে।’ শুধু বর্তমান আন্দোলন হয়, এর আগেও বিভিন্ন সময় ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসক বদলের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প।


তবে আলজাজিরার সাংবাদিক ও বিশ্লেষক জসিম আল-আজ্জাই মনে করছেন, ট্রাম্পের এই বাসনা পূরণ সহজ হবে না। যুক্তি হিসেবে তিনি ইরানের সামরিক সক্ষমতার কথা উল্লেখ করেছেন।



জসিম আল-আজ্জাই লিখেছেন, ইরানের শাসন পরিবর্তন যে কঠিন তা গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতে (ইরান-ইসরায়েল) স্পষ্ট হয়েছে। ওই সংঘাতে কিছু দর্বলতার পাশাপাশি ইরানের স্থিতিস্থাপকতাও প্রদর্শিত হয়েছে। সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রও জড়ালে জবাব হিসেবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। যা বোঝায় রাজনৈতিক ও সামরিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তেহরান কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম। 


ইরানের হাতে বর্তমানে সক্রিয় ও রিজার্ভ মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ সামরিক সদস্য আছে। এর মধ্যে শুধু ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর অধীনে আছে অন্তত দেড় লাখ সেনা। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তারা। 


ইরানের প্রতিক্রিয়া

দেশজুড়ে চলমান ব্যাপক বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ তুলেছেন। শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, দাঙ্গাকারীরা সরকারি সম্পত্তিতে হামলা চালাচ্ছে। বিদেশিদের ‘ভাড়াটে’ হিসেবে যারা কাজ করছে। তেহরান তাদের কোনোভাবেই সহ্য করবে না। 


হঠাৎ কেন বিক্ষোভ

সম্প্রতি ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের বিনিময় মূল্য ছুঁয়েছিল সাড়ে ১৪ লাখ। মুদ্রার এমন নাটকীয় অবমূল্যায়ন প্রভাব ফেলেছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে। এর প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমেছে।



বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, তেহরানে শুরু হওয়া ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ বর্তমানে ইরানের ৩১টির মধ্যে ২৫ প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন।


জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগে ১ মার্কিন ডলার দিয়ে ৮ লাখ ২০ হাজার ইরানি রিয়াল পাওয়া যেত। বর্তমানে তা সাড়ে ১৪ লাখে পৌঁছেছে। ইরান উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানি নির্ভর দেশ। তাই এ ধরনের মুদ্রাস্ফীতি সমাজে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে। সাধারণ মানুষ প্রতিদিনের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেও সমস্যায় পড়ছে। যা বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে।


আটলান্টিক কাউন্সিলের ইরান বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী গিসসু নিয়া মনে করেন, অর্থনৈতিক ধস এই বিক্ষোভের উদ্দীপক। কিন্তু এর মূল কারণ নয়। 


গিসসু নিয়া বলেন, অনেক সময় অর্থনৈতিক সংকট আন্দোলনের প্রাথমিক কারণ হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা যদি স্লোগান ও বিক্ষোভের বিস্তার দেখি, তাহলে ইরানি শাসনব্যবস্থার প্রতি গভীর অসন্তোষ এবং সেই ব্যবস্থাকে উৎখাত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে।