নুরুজ্জামান : ইতিহাস বদলায়, সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। নতুন নেতৃত্ব আসে, নতুন প্রতিশ্রুতি শোনা যায়। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরও সাধারণ মানুষের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা আসে ? নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও স্বস্তিতে বেঁচে থাকার যে প্রত্যাশা মানুষ দীর্ঘদিন ধরে লালন করে, তাকি আদৌ বাস্তবে পূরণ হয় ?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। পুরোনো সরকারের পতনের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল-দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, দুর্নীতি কমবে, অপরাধের বিচার নিশ্চিত হবে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদে বাঁচার অধিকার ফিরে পাবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায় পেরিয়ে নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত আলোচনা থেমে নেই।
রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য কেবল ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, জীবিকা কতটা স্বস্তিদায়ক এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ কতটা নিশ্চিত, তার ওপর । দিনদুপুরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, খুন, ধর্ষণ ও বিভিন্ন সহিংসতার খবর মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি করে। মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদে ফিরতে চান। ব্যবসায়ী চান নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে, অভিভাবকেরা চান সন্তানদের নিরাপত্তা। এসব প্রত্যাশা পূরণ করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগ উঠলেই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করা, অপমান করা কিংবা জনতার নামে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা ইত্যার্দি । একটি কথা মতে রাখতে হবে, মব সৃষ্টি করে বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, আইনানুগ প্রক্রিয়ায়। অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনের শাসন দুর্বল হলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
জনজীবনের আরেকটি বড় সংকট অর্থনৈতিক চাপ। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় এবং আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্য বহু পরিবারকে প্রতিনিয়ত হিসাব কষে চলতে বাধ্য করছে। বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার আগে মানুষ যখন বারবার ভাবেন, তখন উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।এর সঙ্গে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ঋণখেলাপি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি দপ্তরে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ।
এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজন স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি এবং নিরপেক্ষ জবাবদিহি। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষ, তবে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রমাণিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন মুখ সামনে আসে, নতুন আশ্বাস তৈরি হয়। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই সুশাসনের নিশ্চয়তা নয়। কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কিংবা আন্তর্জাতিক পরিচিতি-কোনোটিই এককভাবে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে না।
একই ভাবে নির্বাচনে জয়লাভ করাও জনগণের প্রত্যাশা পূরণের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। নেতৃত্বের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার কাজ , সততা , জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ভিত্তিতে। আমরা এমন রাজনীতি চাই না, যেখানে ক্ষমতায় থাকলে নিজের দলের অন্যায় আড়াল করা হয়, আর বিরোধী দলে গেলে একই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়। অন্যায় যেই করুক, তার বিচার হতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় কারও অপরাধের ঢাল হতে পারে না। আবার রাজনৈতিক বিরোধিতার অজুহাতে কারও অধিকার হরণ করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা। সরকারের সমালোচনা মানেই শত্রুতা নয়। বরং গঠনমূলক সমালোচনা. ভুল সংশোধন এবং জনআস্থা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা । এ ক্ষেত্রে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। গুজব ছড়ানো, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অপরাধকে সমর্থন করা কিংবা সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া কোনো ভাবেই কাম্য নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে, তবে তা হতে হবে সত্যনির্ভর, যুক্তিসংগত ও শান্তিপূর্ণ।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষ ছিনতাইয়ের ভয়ে আতঙ্কিত হবেন না , নারী ও শিশু নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন , তরুণেরা মাদক ও বিকাশ হ্যাকার অপরাধ থেকে দূরে থাকার সুযোগ পাবেন এবং ন্যায় বিচারের জন্য সাধারণ মানুষকে অসহায়ের মতো ঘুরতে হবে না। এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে আইন বড়, প্রতিহিংসার চেয়ে মানবতা বড় এবং দলীয় স্বার্থের চেয়ে জনগণের স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে। সরকার পরিবর্তন একটি রাজনৈতিক ঘটনা, কিন্তু সুশাসন প্রতিষ্ঠা একটি চলমান দায়িত্ব। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় , ক্ষমতা জনগণের অর্পিত আমানত। তাই সরকারের কাছে প্রশ্ন তোলা , সমালোচনা করা এবং জবাবদিহি দাবি করা নাগরিকের অধিকার।
শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ রাজনীতির কাছে খুব বেশি কিছু চান না। তাঁরা চান নিরাপত্তা, ন্যায় বিচার, সব কিছুতে ন্যায্য মূল্যে , প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামর্থ্য, দুর্নীতিমুক্ত সেবা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। সরকার যে দলেরই হোক, এই প্রত্যাশা গুলো পূরণ করা হোক তাদের প্রধান অঙ্গীকার। কারণ ইতিহাস বদলায়, সরকার বদলায়, ক্ষমতার আসনে বসা মানুষের মুখও বদলায়। বদলায় অনেকের ভাগ্য। কিন্তু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা , ন্যায় বিচার ও সুশাসনের আকাঙ্ক্ষা বদলায় না। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়-ক্ষমতার পালাবদলে সত্যিই কি বদলায় সাধারণ মানুষের ভাগ্য , নাকি শুধু বদলে যায় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষ গুলো ?