ডিএনএন ডেস্ক: ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীকে ‘ব্যর্থ পণ্য’ আখ্যা দিয়ে কংগ্রেসের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার অভিযোগ, একজন নেতার বারবার ব্যর্থতা আড়াল করতে গিয়ে কংগ্রেস ভারতের অর্জন, সক্ষমতা ও অগ্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিটে বক্তব্য দিতে গিয়ে কংগ্রেসের সংসদীয় আচরণ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির সমালোচনার পাশাপাশি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে মোদির কটাক্ষ
বক্তব্যে রাহুল গান্ধীকে সরাসরি নিশানা করে মোদি তাকে কংগ্রেসের ‘ব্যর্থ পণ্য’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার ভাষ্য, একটি রাজনৈতিক দল তার নেতৃত্ব নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটি তাদের নিজস্ব বিষয়। তবে একজন নেতার বারবার ব্যর্থতা আড়াল করতে গিয়ে কংগ্রেস ভারতের অর্জন, সক্ষমতা ও অগ্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
কংগ্রেসের নেতৃত্বের সমালোচনা করতে গিয়ে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর রকেট উৎক্ষেপণের প্রসঙ্গও টানেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শ্রীহরিকোটা থেকে এক বছরে যতবার রকেট উৎক্ষেপণের চেষ্টা করা হয়, কংগ্রেস তার নেতাকে সামনে আনতে তার চেয়েও বেশি ব্যর্থ চেষ্টা চালায়।
মোদির দাবি, কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট ও নেতৃত্বকেন্দ্রিক রাজনীতি দলটির জন্যই বোঝা হয়ে উঠেছে। একটি পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করতে গিয়ে দলটি দেশের স্বার্থকেও বিতর্কের মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
‘কংগ্রেসের কারণে প্রকৃত সমালোচকরাও কোণঠাসা’
বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মোদি বলেন, গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে কংগ্রেসের সংসদীয় আচরণ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির কারণে সরকারের সমালোচনা করতে আগ্রহী অন্য বিরোধী নেতাদের বক্তব্যও যথাযথভাবে সামনে আসতে পারছে না।
তার অভিযোগ, সংসদে কংগ্রেসের হট্টগোলের কারণে বিরোধী দলের অনেক তরুণ ও মেধাবী সংসদ সদস্য নিজেদের মতামত তুলে ধরার সুযোগ হারাচ্ছেন। একজন নির্দিষ্ট নেতাকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে কংগ্রেস অন্য বিরোধী নেতাদের কণ্ঠও রুদ্ধ করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মোদি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা এবং কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানানো প্রয়োজন। কিন্তু কংগ্রেসের কর্মকাণ্ডের কারণে সরকারের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা আন্দোলন ও সংস্কারের উদ্যোগও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তার দাবি।
কংগ্রেসকে ‘পরজীবী’ আখ্যা দিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, দলটি অন্য কারও অগ্রগতি দেখতে চায় না। এ সময় কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে কী বললেন মোদি?
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমালোচনার পাশাপাশি বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন। মোদি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব উপলব্ধি করেছিল যে সংলাপ ও সহযোগিতা ছাড়া স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। সে সময় জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে নতুন শক্তির উত্থান এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের জটিলতা বাড়লেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সমান গতিতে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মোদির মতে, যেসব দেশ একসময় বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে দূরে ছিল, তারাও এখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজেদের ন্যায্য অবস্থান দাবি করছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতা ও বিদ্যমান বৈশ্বিক কাঠামোর মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করে তোলা জরুরি।
বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও সমুদ্রপথ ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
বৈশ্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদি বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও সমুদ্রপথকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাণিজ্যকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রযুক্তি হয়ে উঠছে প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে তার এই বক্তব্য গুরুত্ব বহন করে।
মোদির ভাষ্য, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বললেই হবে না; পরিবর্তিত বাস্তবতাকে স্বীকার করে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে হবে এবং দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার মানসিকতা আরও জোরদার করতে হবে।
বিশ্বমঞ্চে ভারতের ভূমিকার ওপর জোর
পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, নতুন শক্তিগুলোর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
মোদির বক্তব্যে একদিকে ভারতের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে, অন্যদিকে দেশের রাজনৈতিক বিরোধিতার ধরন নিয়েও ছিল সমালোচনা।
রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসকে আক্রমণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত দ্বন্দ্ব এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস