নুরুজ্জামান : এক সময় মানুষের বিপদে মানুষ ছুটে যেত। কারও বাড়িতে মৃত্যু হলে প্রতিবেশীরা পাশে এসে দাঁড়াতেন, শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন বেদনা। কেউ অসুস্থ হলে স্বজন কিংবা প্রতিবেশী পরিচিত জনেরা হাসপাতালে ছুটে যেতেন একটু সান্ত্বনা, সাহস ও প্রার্থনা নিয়ে। রাস্তায় কেউ বিপদে পড়লে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াটাই ছিল অতি স্বাভাবিক ও মানবিক আচরণ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সামাজিক আচরণেও যেন এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। ইদানিং লক্ষণীয় অধিকাংশ মানুষের বিপদে হারিয়ে যাচ্ছে সহমর্মিতা?
প্রশ্ন জাগে, আমরা কি ক্রমেই অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছি? নাকি মানবিকতার জায়গাটি দখল করে নিচ্ছে ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম ব্যস্ততা আজকাল কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কিংবা কেউ বিপদে পড়লে অনেকের প্রথম প্রতিক্রিয়া সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া নয়, বরং বিপদগামী মানুষের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে নেওয়া অথবা নিজের পকেট থেকে স্মার্ট ফোন বের করে ভিডিও ধারণ করা - আর হাসপাতালের বেডে অসহায় রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দেয়ার পরিবর্তে কারও কারও ব্যস্ততা ছবি কিংবা ভিডিও ধারণে। মৃতের বাড়িতে শোকের পরিবেশ ছাপিয়ে কখনো কখনো জমে ওঠে অপ্রয়োজনীয় গল্পের আসর শোকাহত পরিবারের কষ্ট অনুভব করার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি কিংবা আবেগঘন স্ট্যাটাস প্রকাশ করাই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কেউ কাঁদছে, কেউ তাকিয়ে দেখছে, কেউ ভিডিও করছে , আবার কেউ-কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছে-খুবই দুঃখ জনক। অথচ যে মানুষটি বিপদের মুখোমুখি, তার তখন প্রয়োজন একটি সাহসী হাত, কয়েকটি সান্ত্বনার বাক্য কিংবা তাৎক্ষণিক সহযোগিতা।
একটি পোস্ট, কয়েকটি লাইক কিংবা অসংখ্য মন্তব্য কোনো বিপন্ন মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে না। পারে না শোকাহত হৃদয়ের ক্ষত মুছে দিতে।প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগ কে করেছে সহজ, দ্রুত ও বিস্তৃত। মুহূর্তেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে সংবাদ, ছবি ও অনুভূতির প্রকাশ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের বন্ধু হাজার হাজার, পরিচিতির তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। জন্মদিনে শুভেচ্ছা, উৎসবে অভিনন্দন, চাকুরী পাওয়া এবং শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে শুরু করে যে কোন আনন্দে অভিনন্দন বার্তা- সবকিছুতেই আমরা বেশ সক্রিয়। কিন্তু বাস্তব জীবনের দুঃসময়ে সেই পরিচিত মুখগুলোর অনেককেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ভার্চুয়াল জগতে সম্পর্কের এত বিস্তার, অথচ বাস্তব জীবনের বিপদে মানুষ কখনো কখনো হয়ে পড়ে ভীষণ একা।
এখানেই আমাদের সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শোক কি কেবল প্রকাশের বিষয়? ভালোবাসা কি শুধুই প্রদর্শনের উপকরণ? সহমর্মিতা কি কয়েকটি সুন্দর শব্দের সমষ্টি? মানুষের দুঃখ-কষ্টকে যদি আমরা কেবল কনটেন্ট হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে আমাদের বিবেকের অবস্থান কোথায়?অবশ্য প্রযুক্তি নিজে কোনো অপরাধী নয়। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সৃষ্টি, আর এগুলোর যথাযথ ব্যবহার অনেক ইতিবাচক পরিবর্তনও আনতে পারে। রক্তের প্রয়োজনে দ্রুত রক্তদাতা খুঁজে পাওয়া, অসহায় মানুষের চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ, দুর্যোগে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া কিংবা হারিয়ে যাওয়া মানুষকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা অনস্বীকার্য। অনেক সময় একটি ছবি বা ভিডিও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে, অপরাধের প্রমাণ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই সমস্যা প্রযুক্তিতে নয় , সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। বিবেকের ব্যবহারে এবং মানবিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তনে। যখন একটি মানুষের জীবন বাঁচানোর চেয়ে সেই মুহূর্তের ভিডিও ধারণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখনই প্রশ্নবিদ্ধ হয় আমাদের মনুষ্যত্ব।
তবে মানবিকতার সব আলো এখনো নিভে যায়নি। এই সমাজেই এমন মানুষ আছেন, যাঁরা অপরিচিত মানুষের চোখের জল মুছিয়ে দেন। নিজের সীমিত সামর্থ্য নিয়েও ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেন। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থের কথা না ভেবে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ান। তাঁরা প্রচারের আলোয় আসেন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের মহত্ত্বের বিজ্ঞাপন ও দেন না। নিঃশব্দে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েই তাঁরা বাঁচিয়ে রাখেন মনুষ্যত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য।
এমন মানুষদের কাছ থেকেই আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। কারণ মানবিকতা কোনো প্রদর্শনীর বিষয় নয়, এটি মানুষের অন্তরের পরিচয়। কারও বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অসহায়ের কথা মন দিয়ে শোনা, শোকাহত মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করাই প্রকৃত মানবিকতা। সব সময় বড় কিছু করার প্রয়োজন নেই , কখনো একটি আন্তরিক কথা, একটি সহযোগিতার হাত কিংবা সময় মতো নেওয়া একটি ছোট উদ্যোগও কারও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি শোকবার্তা প্রকাশ করার চেয়ে শোকাহত পরিবারের পাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবে বসে থাকা অনেক বেশি মূল্যবান হতে পারে। বিপন্ন মানুষের ভিডিও ধারণ করার আগে তাকে সাহায্য করা জরুরি।
কোনো দুর্ঘটনাস্থলে ভিড় না বাড়িয়ে উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করা, আহত ব্যক্তির গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং প্রয়োজনে দ্রুত জরুরি সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রথম দায়িত্ব। সময় এসেছে নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর। আমরা কী ধরনের সমাজ গড়ে তুলছি? আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কি শিখছে মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়াতে, নাকি শিখছে দুঃখকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শনের উপকরণ বানাতে? প্রযুক্তিতে উন্নত হওয়া নিঃসন্দেহে অগ্রগতি, কিন্তু সেই অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন আমাদের হৃদয়ও হবে উদার, বিবেক হবে জাগ্রত এবং আচরণে প্রতিফলিত হবে প্রকৃত মানবিকতা।
আসুন,আমরা ক্যামেরা নামিয়ে প্রয়োজনে হাত বাড়াই। লোক দেখানো শোক নয়, হৃদয়ের গভীর থেকে সহমর্মিতা প্রকাশ করি। কারও দুঃসময়কে কনটেন্টে পরিণত না করে তার কষ্ট অনুভব করি অসহায় মানুষের আর্তনাদে নিজেদের বিবেককে জাগিয়ে তুলি। কারণ পৃথিবী সুন্দর হয় না শুধু প্রযুক্তির ছোঁয়ায়, মানুষ বড় হয় না শুধু পরিচিতির সংখ্যায়। সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব স্মার্ট ফোনের পর্দায় নয়, বরং বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহসে, অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতায় এবং নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসতে জানার মধ্যেই নিহিত। একদিন সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে আমাদের অসংখ্য পোস্ট, মুছে যাবে ছবির স্মৃতি, থেমে যাবে নোটিফিকেশনের শব্দ। কিন্তু মানুষের বিপদে কে পাশে দাঁড়িয়েছিল, কে বাড়িয়ে দিয়েছিল সাহায্যের হাত, আর কে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল-সেই স্মৃতি হয়তো থেকে যাবে মানুষের হৃদয়ে।
শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রত্যেকের বিবেকের দরজায় একটি প্রশ্নই কড়া নাড়বে-মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে, সত্যিকার অর্থে মানুষ হতে পেরেছিলাম কি ?