ডিএনএন ডেস্ক: আজকের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরটি কেবল বাংলাদেশের রাজনীতির এক নক্ষত্রপতনের সাক্ষী নয়, বরং একজন পুত্রের নিঃস্ব হওয়ার করুণ ইতিহাসও। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটলো এক অবিস্মরণীয় সম্পর্কের। জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ আক্ষরিক অর্থেই এতিম হলেন। যে মাথার ওপর মা ছিলেন এক বিশাল ছায়া, যে আঁচল ছিল পরম নিশ্চিন্তের ঠিকানা, সেই আশ্রয়টি আজ চিরতরে বিলীন হয়ে গেল।
তারেক রহমানের জীবনের ট্র্যাজেডি শুরু হয়েছিল সেই আশির দশকের শুরুতে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কিশোর তারেক হারিয়েছিলেন তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে পিতৃহারা হওয়া সেই কিশোরের কাছে মা বেগম খালেদা জিয়াই ছিলেন সব। সেই থেকে শুরু করে দীর্ঘ চার দশক মা-ই ছিলেন তার রাজনীতির শিক্ষক, অনুপ্রেরণা আর সাহসের উৎস।
পিতার অকাল বিদায়ের পর মা যেভাবে আগলে রেখেছিলেন, তাতে করে তারেক রহমান ও তার ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর কাছে মা ছিলেন এক অজেয় হিমালয়।
নিয়তি তারেক রহমানের ওপর দ্বিতীয় বড় আঘাতটি হেনেছিল ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। মালয়েশিয়ার প্রবাস জীবনে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান তার একমাত্র ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো। সেই সময়টি ছিল তারেক রহমানের জীবনের সবচেয়ে বেদনাবিধুর মুহূর্ত।
তৎকালীন রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে তিনি তখন লন্ডনে নির্বাসিত। ছোট ভাইয়ের নিথর দেহটি শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখার বা তার কফিন কাঁধে নেওয়ার সুযোগটুকুও পাননি তিনি। বিদেশের মাটিতে ভাইয়ের জন্য তার সেই নীরব কান্না আর যোজন যোজন দূরত্বের সেই হাহাকার আজও তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। ছোট ভাইয়ের বিদায়ে মায়ের একাকীত্বের কথা ভেবে প্রবাসে একাই শোকের সাগর পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি।
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, ১/১১-এর সময়কার অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান তারেক রহমান।
এরপর দীর্ঘ ১৭টি বছর তাকে কাটাতে হয়েছে প্রবাসে, দেশের মাটি ও মায়ের মমতা থেকে দূরে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ নির্বাসনে মা-ছেলের সম্পর্কের সেতুবন্ধন ছিল কেবল ভিডিও কল আর ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক পশলা স্বস্তি হয়ে এসেছিল বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর। দীর্ঘ দেড় যুগ পর সেখানে মায়ের দেখা পান তারেক রহমান। মায়ের সান্নিধ্যে কাটানো সেই দিনগুলো ছিল তার প্রবাস জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি। এরপর ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল অন্যরকম। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মায়ের দেখা পেলেও, সেই মমতা উপভোগ করার সময় পেলেন না তিনি।
দেশে ফেরার পর থেকেই এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসকদের সাথে দিনরাত বৈঠক করেছেন তারেক রহমান, প্রতিরাতেই এভারকেয়ারে গিয়ে মায়ের কাছে সময় কাটিয়েছেন। অপেক্ষায় ছিলেন মা সুস্থ হয়ে আবার গুলশানের ‘ফিরোজা’য় আবারও ফিরে যাবেন। অংশ নেবেন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও। কিন্তু আজ ভোরের আলো ফোটার আগেই সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মা পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।
বাবার পর ভাই, আর ১৭ বছর পর দেশে ফিরে মাকে হারানো- এই গভীর শূন্যতা কেবল একজন সর্বস্ব হারানো মানুষই উপলব্ধি করতে পারেন। মা নেই, বাবা নেই, একমাত্র ছোট ভাইটিও নেই- তারেক রহমান আজ জীবনের এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে তিনি কোটি কোটি মানুষের নেতা ঠিকই, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের আঙিনায় এক নিঃসঙ্গ রাজপুত্র।
এভারকেয়ার হাসপাতালের করিডোরে আজ তারেক রহমানের যে বিষাদগ্রস্ত মুখচ্ছবি দেখা গেল, তা ইতিহাসের পাতায় এক ট্র্যাজিক হিরোর প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়ের সাথে সাথে তারেক রহমানের জীবনের শেষ আশ্রয়স্থলটিও আজ স্মৃতি হয়ে গেল। মা নামের সেই অজেয় হিমালয়টি আজ ধসে পড়ল, এর নিচে চাপা পড়ে গেল এক পুত্রের আজন্ম হাহাকার।