নুরুজ্জামান : প্রযুক্তির আত্মবিশ্বাস আর মনের অনট বিশ্বাসের নির্ভরতা-দুটি ভিন্ন পথ, অথচ লক্ষ্য এক , নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো। মানুষের জীবন যেন এক দীর্ঘ যাত্রা। কেউ পাড়ি দেন আকাশ পথে, কেউ নদীর বুকে, কেউ নির্ভর করেন আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর, কেউ অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা আর স্রষ্টার প্রতি অবিচল বিশ্বাসকে সঙ্গী করে এগিয়ে যান অজানার পথে। যাত্রার মাধ্যম আলাদা হতে পারে , পথের বৈশিষ্ট্যও হতে পারে ভিন্ন, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন।
একজন পাইলট আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমান। তাঁর হাতে থাকে দিকনির্ণয়ের যন্ত্র, থাকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রাডার, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর পথনির্দেশনা। আকাশের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে তাঁকে নির্ভর করতে হয় প্রশিক্ষণ, দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর উড়ে চলা। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে হিসাব-নিকাশ, সতর্কতা এবং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর দায়িত্ববোধ।
অন্যদিকে, একজন নাবিক নদীর বুকে নৌকা ভাসিয়ে এগিয়ে যান স্রোত, বাতাস ও প্রকৃতির পরিবর্তনশীল আচরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। নদীর বাঁক, ঢেউয়ের ওঠানামা, বাতাসের গতি কিংবা আকাশের মেঘ , সবকিছুই তাঁর কাছে পথ চেনার একেকটি ভিন্ন ইঙ্গিত। আধুনিক যন্ত্রপাতির সহায়তা সীমিত হলেও তাঁর অভিজ্ঞতা, ধৈর্য, পর্যবেক্ষণক্ষমতা ও বাস্তবজ্ঞান হয়ে ওঠে পথচলার প্রধান অবলম্বন। আর তাঁর হৃদয়ের গভীরে থাকে আল্লাহর ওপর ভরসা, মনে থাকে প্রতিকূলতা পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রত্যাশা। এ জন্য তাকে শরীর থেকে ঘাম ঝরাতে হয়। কখনো-কখনো মনের আনন্দে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গাওয়া সেই কালজয়ী গান ভাঙ্গা সুরে বেরিয়ে আসে- “ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে...’’ ।
পাইলট ও নাবিকের এই দুই যাত্রাপথ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়-উপায় ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য ভিন্ন হয়ে যায় না। একজন প্রযুক্তির সহায়তায় আকাশের বিশালতা অতিক্রম করেন, অন্যজন প্রকৃতির সঙ্গে বোঝাপড়া করে নদীর বুকে পথ খুঁজে নেন। দু’জনেরই প্রয়োজন জ্ঞান, দক্ষতা, সতর্কতা ও ধৈর্য। আর দুজনের মনেই কাজ করে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রত্যাশা।
এখানে বিশ্বাস ও প্রচেষ্টার সম্পর্কটিও তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহর ওপর ভরসা করা মানে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয় , বরং সাধ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও আশাবাদী থাকা। ইসলামের দৃষ্টিতেও ভরসা করা, কিংবা আস্থা রাখার প্রচেষ্টার সঙ্গে দায়িত্বশীলতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ তার সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে, প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করে, তারপর ফলাফলের ব্যাপারে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে। জীবনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম। কেউ উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে পুঁজি করে এগিয়ে যান, কেউ শ্রম, অভিজ্ঞতা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান গড়ে তোলেন। কারও যাত্রাপথ মসৃণ, কারও সামনে থাকে ঝড়, অনিশ্চয়তা ও নানা সীমাবদ্ধতা। কিন্তু সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি হয় তখনই, যখন মানুষ নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগায়, বাস্তবতাকে বোঝে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয় এবং আশা হারায় না।
পাইলটের হাতে থাকা যন্ত্র তাঁকে পথের দিকনির্দেশনা দেয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তাঁরই। নাবিকের বিশ্বাস তাঁকে মানসিক শক্তি জোগায়, কিন্তু নদীর স্রোত বুঝে হাল ধরার কাজটিও তাঁকেই করতে হয়। অর্থাৎ, প্রযুক্তি কিংবা বিশ্বাস, কোনোটিই দায়িত্বশীল প্রচেষ্টার বিকল্প নয় । বরং সঠিক জ্ঞান, বিবেচনা ও কর্মপ্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত হলেই এগুলো মানুষের যাত্রাকে অর্থবহ করে তোলে। আমাদের সমাজেও এই উপলব্ধি জরুরি। মানুষের পেশা, আর্থিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা জীবনযাপনের ধরন দিয়ে তার সংগ্রাম ও স্বপ্নের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। যে মানুষটি আকাশপথে আধুনিক উড়োজাহাজ চালান, তাঁর যেমন দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ আছে, তেমনি নদীতে নৌকা চালানো মানুষটির জীবনেও রয়েছে অনিশ্চয়তা, শ্রম ও সাহসের পরীক্ষা। দুজনের অবদানকে বুঝতে হলে তাঁদের কাজের পরিবেশ ও বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে।
অতএব, পাইলট ও নাবিকের গল্প কেবল দুটি পেশার তুলনা নয় , এটি মানুষের জীবনদর্শনেরও প্রতিচ্ছবি ও বটে । পথের ধরন বদলাতে পারে, উপকরণ বদলাতে পারে , পরিস্থিতিও বদলে যেতে পারে , তবু সৎ উদ্দেশ্য, দায়িত্বশীল প্রচেষ্টা, ধৈর্য ও আশাবাদের গুরুত্ব কখনো ফুরিয়ে যায় না। শেষ পর্যন্ত আকাশের পাইলট আর নদীর নাবিক আমাদের একই শিক্ষা দেন। গন্তব্যে পৌঁছাতে শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না, জানতে হয় পথ, নিতে হয় প্রস্তুতি, সামলাতে হয় প্রতিকূলতা এবং ধরে রাখতে হয় আত্মবিশ্বাস। আর জীবনের অনিশ্চিত যাত্রায় নিজের সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় প্রশান্তি। পথ আলাদা হতে পারে, যাত্রার উপকরণ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু নিরাপদ গন্তব্যের প্রত্যাশা , দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার এবং আশার আলো, মানুষকে শেষ পর্যন্ত একই সুতোয় বেঁধে রাখে।