কৃষিবিদ মনিরুজ্জামান বাবুল : আজ ২১ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব আলঝাইমার্স দিবস। প্রতি বছর এ দিনে স্মৃতিভ্রংশ তথা ডিমেনশিয়া ও আলঝাইমার্স রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালন করা হয়।আলঝাইমার্স মূলত এক ধরনের অগ্রগতিশীল মস্তিষ্কজনিত রোগ। প্রবীণ বয়সে এটি বেশি দেখা যায়। গবেষণা বলছে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ব্রেনের নিউরন সেল ধ্বংস হয়, প্রায় চল্লিশ ভাগ কোষ নিঃশেষ হলে এ রোগের প্রকোপ বাড়ে। ফলে স্মৃতিশক্তি ক্ষয়িষ্ণু হয়, অতীত ভুলে যাওয়া শুরু হয়, যা রোগী ও পরিবার উভয়ের জন্যই এক কঠিন বাস্তবতা।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ প্রবীণ বসবাস করছেন। ২০৫০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে প্রতি ৫ জনে ১ জন প্রবীণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রবীণ মানেই দুর্বল নয়—কখনো তারা ছিলেন কর্মচঞ্চল যুবক, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অংশ। সময়ের বিবর্তনে বয়সজনিত শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় তারা আজ ভঙ্গুর হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ—আলঝাইমার্স।
একটি বাস্তব ঘটনা এখানে প্রাসঙ্গিক। চুয়াডাঙ্গার মফু মিয়া নামের এক প্রবীণ হঠাৎ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। সপ্তাহব্যাপী খোঁজাখুঁজির পর রাজশাহীর রেলস্টেশনে ক্ষুধার্ত ও অসহায় অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে জানা যায়, তিনি ডিমেনশিয়ার রোগী ছিলেন। এ অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, একবার আক্রান্ত হলে রোগীকে একা রেখে নিরাপদে রাখা সম্ভব নয়।
বিশ্ব আলঝাইমার্স দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আজকের যুবকই আগামীর প্রবীণ। তাই সময় থাকতে ব্যবস্থা নিতে হবে। আক্রান্ত প্রবীণদের জন্য শান্ত, পরিচ্ছন্ন, নিরিবিলি পরিবেশে কমিউনিটি বেইজড কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলা জরুরি। উন্নত দেশে ছাত্রছাত্রীরা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে প্রবীণ সেবায় অংশ নেয়, যা ভবিষ্যতে নিজের প্রয়োজনে সেবা গ্রহণের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আমাদের দেশেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
এ রোগ নিরাময়হীন হলেও সমন্বিত উদ্যোগে রোগীর কষ্ট লাঘব করা যায়।
আলোক দূষণ, শব্দ দূষণ এবং মানসিক চাপ এ রোগের গতিপথ ত্বরান্বিত করে বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, একইভাবে কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে আঁশজাতীয় খাবার, বাদাম তিষি, মুল কন্দ জাতীয় খাবার এরোগকে বিলম্বিত করে বলে তথ্য সূত্রে জানা যায়, সুস্থতায় যাপিত জীবনে আয়ূ্বেদিক চর্চাকে
উৎসাহিত করেছেন চারক সংহিতায়।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র মিলে যদি প্রবীণবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে, তবে শুধু আলঝাইমার্স নয়—সমগ্র প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনে প্রশান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
নবী (সা.) বলেছেন: “যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের প্রতি সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়” (আল-তিরমিযী)।
তাহলে প্রবীণ সেবার দায়িত্ব শুধুমাত্র পরিবার বা ব্যক্তির নয়, বরং পুরো সমাজের। বয়োজ্যেষ্ঠর সম্মান যতন পারিবারিক সামাজিক পরিমন্ডল পেরিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনকেও করতে পারে সৌন্দর্যমন্ডিত!
আলঝাইমার্স মোকাবিলা এখন আর একক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব।
“প্রবীণের যত্নে নবীন”এই স্লোগানেই কমিউনিটি কেয়ার ইনিশিয়েটিভ হতে পারে মানবিক ভবিষ্যৎ গড়ার বড় অবলম্বন।
লেখক- একটিভিস্ট, কমিউনিটি কেয়ার ফাউন্ডেশন ও উদ্যোক্তা, মমতা নার্সিং ইনস্টিটিউট