ডিএনএন ডেস্ক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সদ্য বিদায়ি উপাচার্য (ভিসি) ড. সালেহ হাসান নকীবের ১৮ মাসের মেয়াদে হওয়া সব নিয়োগের ফাইল ও তথ্য তলব করেছেন নতুন উপাচার্য ড. ফরিদুল ইসলাম। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের সুপারিশে নিয়োগ পাওয়া ড. নকীব ও তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে চরম স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই দেড় বছরে দলীয় বিবেচনায় ও আত্মীয়তার সূত্রে বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরে ১৯৫ জন শিক্ষক, ৩১৫ জন শ্রমিক-কর্মচারী এবং ৫ জন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ হিসাবে এরই মধ্যে বিদায়বেলায় তড়িঘড়ি করে দেওয়া দুজনের নিয়োগ বাতিল করেছে বর্তমান প্রশাসন।
জানা গেছে, বিদায় নেওয়ার আগে উপ-উপাচার্য মাঈন উদ্দীন ২৮ মার্চ অনেকটা গোপনে রাবির পরিবহণ দপ্তরে আলমগীর হোসেন ও নাজমুল ইসলাম নামের দুজনকে নিয়োগ প্রদান করেন। সোমবার উপাচার্যের আদেশে এই দুজনের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম জানান, ঠিক কতজন কোথায় কীভাবে নিয়োগ হয়েছে এসব তথ্য তার জানা প্রয়োজন। এটা জানা তার দায়িত্বেরই অংশ।
এ কারণে তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও শাখাগুলোকে সব নিয়োগের তথ্য দিতে বলেছেন। সব বিভাগ ও শাখাগুলো থেকে তথ্য আসার পর তিনি জানতে পারবেন গত ১৮ মাসে কোথায় কতজন কীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন।
রাবি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় সমর্থন দেন রাবির সদ্য বিদায়ি উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব। আন্দোলনের সময় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত পোস্ট দেন। তবে জুলাই আন্দোলনে অনেক শিক্ষকের নকীবের চেয়েও ঢের বেশি অবদান থাকলেও রাবির বৈষম্যবিরোধী নেতাদের বিশেষ সুপারিশে ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫তম উপাচার্য হিসাবে নিয়োগ পান পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক।
শিক্ষক শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতাদের সুপারিশে নিয়োগ পেয়ে অধ্যাপক নকীব কার্যত তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাদের সব অন্যায় আবদার একে একে পূরণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিজেকে মহান ব্যক্তি হিসাবে তুলে ধরলেও ভিসির দায়িত্ব পেয়েই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরতে পরতে বৈষম্যের বীজ বপন করেন। শুরু করেন কোটা চর্চা। একটি বিশেষ দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় নিয়োগের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন করেন।
এদিকে উপাচার্য হয়েই তিনি তার রানিংমেট হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) পদে বেছে নিয়েছিলেন হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাঈন উদ্দীনকে। জামায়াতপন্থি শিক্ষক মাঈন উদ্দীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি জুলাই আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয় ক্যাডার ও নিজের এলাকার লোকজন নিয়োগ দেন।
জানা গেছে, উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য ১৮ মাসে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে মোট ৩১৫ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে নিয়োগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে। দৈনিক ৭৫০ টাকা হারে তাদের বেতনভাতা (মজুরি) দেওয়া হচ্ছে। জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণের কথা বলে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উপ-উপাচার্য প্রথমে নিয়োগ দেন তার নিজ জেলা ফেনী দাগনভুঞার আবু বকর সিদ্দিক ও শাহরিয়ার তামিমকে। নিয়োগ তালিকায় এই দুটি নামই প্রথমে রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন আবু বকর সিদ্দিক ও শাহরিয়ার তামিম তার আত্মীয়। তাদের রাবির ঢাকা গেস্ট হাউজে পদায়ন করা হয়। অন্য যারা নিয়োগ পেয়েছেন তারাও একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নেতাকর্মী।
উপাচার্য হয়েই অধ্যাপক নকীব ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর সিন্ডিকেটের ৫৩৫তম সভায় নিজের শ্বশুর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. একেএম আজহারুল ইসলামকে ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ করেন। জামায়াতের শূরা সদস্য এই শিক্ষক এখনো সস্ত্রীক ভিসির বাসভবনেই বসবাস করেন।
এ বিষয়ে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নকীব কোনো কথা বলতে চাননি। তবে সাবেক উপ-উপাচার্য ড. মাঈন উদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, রাবি মেডিকেল সেন্টারে কোনো ডাক্তারই ছিল না। আমরা তড়িঘড়ি করে পাঁচজন ডাক্তার পাঠিয়েছিলাম। তারা সবাই যোগ্য। অন্যান্য নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, কর্মচারী সংকটে দাপ্তরিক কাজকর্ম করা যাচ্ছিল না। এ কারণে হলের প্রভোস্ট, অনুষদের ডীন, বিভাগের সভাপতি অথবা বিভিন্ন শাখা ও দপ্তরের প্রধানরা দৈনিক মজুরিতে কিছু লোকজনকে কাজ করাচ্ছেন। আমরা অনুমোদন দিয়েছি। তবে সংখ্যাটা ৩১৫ জন নয়। অনেক কম। এটা আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হচ্ছে। আমরা ১৯৫ জন শিক্ষক নিয়োগ করেছি অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে। বিদায়ি উপাচার্যের নেতৃত্বে আমরা কিছু ভালো পদক্ষেপ নিতে চাইলে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। এরপরও আমরা অত্যন্ত সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রশাসন পরিচালনা করেছি। ড. নকীবের মতো যোগ্য উপাচার্য রাবি পরিবার আর কোনোদিন পাবে না বলেও দাবি করেন তিনি। সূত্র-যুগান্তর