৩ কার্তিক, ১৪৩৩
১৮ অক্টোবর, ২০২৬

বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ, উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে সংশয়ে অর্থনীতিবিদরা

Admin Published: June 12, 2026, 12:20 pm
বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ, উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে সংশয়ে অর্থনীতিবিদরা

ডিএনএন ডেস্ক: প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়নে উঠে এসেছে দুই ধরনের চিত্র। একদিকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখছেন কেউ কেউ, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সংশয়ের কথা বলছেন অনেকে। 

 

তাদের অভিমত, নীতিগতভাবে বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়ন দক্ষতা ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর।


উচ্চাভিলাষী বাজেট, বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়


অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এর বাস্তবায়ন সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।



বাংলানিউজকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ছাড়া অর্থনীতির স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। যদিও রাজস্ব নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনকে পৃথক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে এ বিষয়ে এখনো আইন হয়নি এবং বাজেটেও সুনির্দিষ্ট ঘোষণা নেই।


এমনকি সংস্কার কার্যক্রম শুরু হলেও তার সুফল পেতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।

মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি বলেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে থাকলেও আগামী কয়েক মাসে তা ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন সাবেক এ গভর্নর।


তার মতে, বাজেটের আকার বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিকেও উদ্বেগজনক বলে মনে করেন আহসান এইচ মনসুর। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংকট মোকাবিলায় সরকারের বড় ধরনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াবে। তার মতে, সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩০ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।


রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাকেও তিনি অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন। চলতি অর্থবছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি থাকার পর নতুন অর্থবছরে আরও প্রায় দুই লাখ এক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণকে তিনি ‘অসম্ভব টার্গেট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।


এক কথায় বাজেটের মূল্যায়ন করতে গিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকার একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট করেছে, তবে তা বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।


আশার আলো দেখছেন আবু আহমেদ: 


অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ মনে করছেন, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে নিম্নমুখী অর্থনীতিকে চাঙা করতে এবারের বাজেট ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তার মতে, পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে সরকারের মোট আয়ের প্রায় ৭২ শতাংশ পরিচালন ব্যয়ে চলে গেলেও সেটিকে ৬৬ থেকে ৬৮ শতাংশে নামিয়ে আনার উদ্যোগকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।


আবু আহমেদের বলেন, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে ঘাটতি বাজেটের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হবে। একই সঙ্গে বন্ড ও ইসলামি সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি হলে পুঁজিবাজারও শক্তিশালী হবে।


কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ, কর ছাড়, কর অবকাশ এবং মোবাইল ফোনের সিমের ওপর আরোপিত নির্দিষ্ট কর প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপগুলো বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করবে বলেও মনে করেন তিনি।


তিনি বলেন, বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা কম থাকায় আপাতত সরকারকেই অর্থনৈতিক কাজে নেতৃত্ব দিতে হবে। তবে সুদের হার কমানো ও প্রণোদনা অব্যাহত থাকলে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ আবারও গতি পাবে।


তিনি বাজেটকে ‘জনবান্ধব’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপক হিসেবে কাজ করতে পারে।


বাস্তবসম্মততা নিয়ে প্রশ্ন সিপিডির 


বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও লক্ষ্য ও প্রাক্কলনের বাস্তবসম্মততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।


তার মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক অবস্থানে থাকলেও শেষ দুই মাসে ৯ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে প্রত্যাশা করা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। এ পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।


তিনি বলেন, জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা বেসরকারি বিনিয়োগকে চাপে ফেলতে পারে। এতে তারল্য সংকট ও সুদের হার বৃদ্ধির ঝুঁকিও রয়েছে।


তবে কর ও শুল্ক কাঠামোয় সংস্কার, রপ্তানি সহায়তা, ডিজিটাল কর প্রশাসন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উৎসাহমূলক পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সিপিডি।


ফাহমিদা খাতুনের মতে, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মতো সংস্কার উদ্যোগের প্রতিফলন বাজেটে দেখা গেলেও এগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা: 


বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও মনে করেন, বাজেটের মূল সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

তার মতে, মানবিক অর্থনীতি, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং উদারীকরণের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও এগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ভিত্তি যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।


তিনি বলেন, বাজেটে বৈদেশিক ঋণের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভরতা এবং বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ ভবিষ্যতে আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।


ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের ভাষায়, সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে এ বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার বিষয়।


সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, কিন্তু প্রশ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে:


অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়নে একটি বিষয়ে প্রায় অভিন্ন অবস্থান দেখা গেছে। সেটি হলো প্রস্তাবিত বাজেটে কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির মতো উদ্যোগের প্রতিফলন রয়েছে।


তবে এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর। ফলে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর লক্ষ্য নির্ধারণ নয়, বরং সেই লক্ষ্য বাস্তবে কতটা অর্জন করা সম্ভব হবে।


এদিকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রায়’ শিরোনামে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে জাতির সামনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 


২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেটে আকার প্রস্তাব করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর অনুদানসহ সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব ও বৈদেশিক অনুদান থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক অনুদান ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।