আজ ৫ জুন। বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ দিবস আমাদের শুধু জলবায়ু পরিবর্তন, বৃক্ষরোপণ বা পরিবেশ সংরক্ষণের কথা যেমন স্মরণ করিয়ে দেয় তদরুপ মানুষ, প্রকৃতি, কৃষি এবং মানবিক সম্পর্কের গভীর আন্তঃনির্ভরতার কথাও সামনে নিয়ে আসে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র জনপদ আজ সেই বাস্তবতার এক জীবন্ত উদাহরণ।
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে খরা, পানির সংকট ও তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে লড়াই করছে। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। নদী, খাল, বিল ও জলাধারগুলো হারাচ্ছে তাদের প্রাণশক্তি। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, ফসলের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
সম্প্রতি কয়েকদিনের তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এক দুপুরে সামান্য স্বস্তির আশায় একটি চায়ের দোকানে ঢুকতেই দেখা গেল ঘামে ভেজা এক প্রবীণ চা বিক্রেতাকে। তাঁর ক্লান্ত মুখ যেন খরতপ্ত বরেন্দ্রের প্রতিচ্ছবি। একটুখানি ছায়া, এক গ্লাস পানি কিংবা কিছু সময়ের বিশ্রাম তখন মানুষের কাছে নিরাপদ আশ্রয়ের মতোই মূল্যবান হয়ে ওঠে। এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবেশ সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
কিন্তু পরিবেশের সংকট শুধু প্রকৃতির নয়, এটি মানবিকতারও সংকট। সম্প্রতি রাজধানীতে এক প্রবীণ নারীর মরদেহ নিজ বাসায় কয়েকদিন পর উদ্ধার হওয়ার ঘটনা আমাদের সামাজিক বন্ধনের দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি যদি সহমর্মিতা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক সংযোগ ক্ষয়ে যায়, তবে সেটিও এক ধরনের পরিবেশগত অবক্ষয়।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে কৃষি, জলবায়ু ও সামাজিক উন্নয়নে কমিউনিটি-বেইসড ইনিশিয়েটিভ বা জনগণনির্ভর উদ্যোগ। স্থানীয় কৃষক, যুবসমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবীদের অংশগ্রহণে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাশয় পুনরুদ্ধার, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, বৃক্ষরোপণ এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় স্থানীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সম্প্রতি একজন প্রবীণ নারীর লাশ সাত দিন পর উদ্ধারের মর্মন্তুদ ঘটনায় দেশব্যাপী
সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষত উচ্চ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠিত ছেলেমেয়েদের মায়ের নিষ্ঠুর নিয়তি সমগ্র সভ্যতাকেই প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
ফলশ্রুতিতে সমসাময়িক মানবিক জীবন যাপন ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ উন্নয়নে মানব সূচক এর প্যারামিটার এখন উপজীব্য বিষয়!
যেকারনে প্রবীণ ও একাকী মানুষের খোঁজখবর নিতে ওয়ার্ড ও গ্রামভিত্তিক কমিউনিটি কেয়ার টিম গঠন করে ডাটাবেজ সার্ভিস এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন নাগরিক তৈরি করা, যারা প্রকৃতি সংরক্ষণ, কৃষি উন্নয়ন এবং মানবিক মূল্যবোধ এই তিনটিকে সমান গুরুত্ব দেয়।
কারণ টেকসই উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণে নয়; বরং একটি সচেতন, সহমর্মী, সেবা মনোবৃত্তি র উম্মেষ এবং পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠনের মধ্যেই নিহিত।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—বরেন্দ্রের মাটি, পানি, কৃষি ও প্রকৃতিকে রক্ষা করার পাশাপাশি মানবিক সম্পর্কের বন্ধনও পুনরুজ্জীবিত করা। কারণ সুস্থ পরিবেশ, সমৃদ্ধ কৃষি এবং মানবিক সমাজ—এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে একটি টেকসই ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ।
লেখক- কৃষিবিদ ও এ্যসোসিয়েটস, ইয়েস ফাউন্ডেশন, কমিউনিটি বেসড ইনিশিয়েটিভ, কনসার্ন বাংলাদেশ!