৩ কার্তিক, ১৪৩৩
১৮ অক্টোবর, ২০২৬

দারিদ্র্যবিমোচনে সত্তরের মডেল, খরচ হবে ৫৭৩ কোটি টাকা

Admin Published: September 11, 2026, 12:43 pm
দারিদ্র্যবিমোচনে সত্তরের মডেল, খরচ হবে ৫৭৩ কোটি টাকা

ডিএনএন ডেস্ক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ১৯৮০-এর দশকের আদলে ছবি তৈরির নতুন ট্রেন্ড। এআইয়ের সাহায্যে বর্তমানের ছবি বদলে অনেকে দেখছেন, কয়েক দশক আগে তাদের চেহারা কেমন হতে পারত। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন করে সামনে এসেছে পুরোনো মডেলে গ্রামীণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে দারিদ্র্য কমানোর উদ্যোগ। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পে ১৯৬০ এবং ১৯৭০ সালের মডেল অনুসরণ করে দারিদ্র্য কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।


সম্প্রতি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের উদ্যোগে ‘সেমাউল প্লাস অ্যান্ড পোভার্টি প্রোগ্রাম’ (এসপিইপিপি) শীর্ষক একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। আট বছর ছয় মাস মেয়াদি প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে বার্ড এবং পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ)। প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৭৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। ‘সেমাউল প্লাস অ্যান্ড পোভার্টি প্রোগ্রাম’ কুমিল্লা, ফেনী ও বগুড়ায় দারিদ্র্য কমাতে সফল হলে তা সারা দেশে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।


প্রকল্প পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার ১৯৭০ সালে চালু হওয়া ‘সেমাউল’ মডেলের সঙ্গে ষাটের দশকে বৃহত্তর কুমিল্লায় শুরু হওয়া ‘কুমিল্লা মডেল’-এর ওপর ভিত্তি করে দারিদ্র্যবিমোচনে প্রকল্পটি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্প নথির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়ায় গ্রামীণ জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও স্বাবলম্বন উৎসাহিত করতে ‘সেমাউল’ মডেল শুরু হয়েছিল, যার মূলনীতি ছিল কঠোর পরিশ্রম, স্বাবলম্বন ও সহযোগিতা।


প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত মডেলে সেমাউল মডেলের পরিশ্রম, আত্মনির্ভরতা ও সহযোগিতার নীতির সঙ্গে কুমিল্লা মডেলের সমবায়, সঞ্চয়, তদারকির মাধ্যমে ঋণ প্রদান, স্থানীয় পরিকল্পনা এবং কৃষি সম্প্রসারণের বিষয়গুলো যুক্ত করা হবে। ১০ হাজারের বেশি মানুষ প্রকল্পের আওতায় সরাসরি সহায়তা বা প্রশিক্ষণ পাবেন। এ ছাড়া প্রায় ২২ হাজার ৮০০ পরিবারকে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশ অনুদান হিসেবে দেবে দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন সহযোগীরা। বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার।


অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পাঁচ দশক আগের পুরোনো কোরিয়ান ও কুমিল্লা মডেলের ধারণা একত্র করে দারিদ্র্যবিমোচনের কৌশল তৈরি করলে বর্তমান বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা হবে। অতীতে অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে গ্রামগুলো যেভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল, এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। বাজারের সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার এমন একটি নতুন গ্রামীণ বাস্তবতা তৈরি করেছে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি অনেক বদলে গেছে। বাজার, প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার বিস্তারের কারণে গ্রামের অর্থনীতি এখন আগের মতো বিচ্ছিন্ন নয়। তাই বিদেশি কোনো মডেলের চেয়ে বর্তমান বাস্তবতায় কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।


তবে প্রকল্প প্রস্তাবকারী সংস্থা বার্ড বলছে ভিন্ন কথা। জানতে চাইলে বার্ডের পরিচালক ড. শেখ মাসুদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, কুমিল্লা বা দক্ষিণ কোরিয়ার সেমাউল মডেল হুবহু অনুসরণ করা হবে না। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে মডেল দুটির কার্যকর উপাদানগুলো ব্যবহার করা হবে। তিনি বলেন, ১৯৭০-এর দশকের সেমাউল কিংবা বার্ডের ‘কুমিল্লা মডেল’-এর মূল দর্শন কখনোই পুরোনো হয় না। তবে ৭০-এর দশকের প্রেক্ষাপট আর বর্তমান সময় এক নয়। তাই ২০২৬ সালে এটি প্রয়োগ করতে হলে বর্তমান সময়ের উপযোগী ও আধুনিক করে সেমাউল প্লাস (লেটেস্ট ভার্সন) হিসেবে ফিট করেই বাস্তবায়ন করা হবে। এটি মূলত একটি কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ, যেখানে স্থানীয় জনগণের নিজস্ব চাহিদাকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে।


এদিকে, পুরোনো মডেলে দারিদ্র্য কমানোর প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে অত্যধিক ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের ব্যয় বিভাযন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দারিদ্র্য কমানোর কৌশল শিখতে প্রকল্পের আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ নিতে যাবেন ১০৪ জন কর্মকর্তা। দক্ষিণ কোরিয়ায় ১০৪ কর্মকর্তাকে ১২টি ব্যাচে প্রশিক্ষণ দিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর বাইরে দেশে ৩৮৬টি ব্যাচে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য রাখা হয়েছে আরও ৭৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। বিদেশ ও দেশীয় প্রশিক্ষণ মিলিয়ে এ খাতেই ব্যয় হবে প্রায় ৮৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।


শুধু প্রশিক্ষণেই এত বড় ব্যয়ের পাশাপাশি কুমিল্লায় একটি ‘এসপিইপিপি প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১০ দশমিক ৭১ শতাংশই যাবে এই কেন্দ্র নির্মাণে। প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকার পরও আলাদা করে ৬১ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নতুন স্থাপনা নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর বাইরে ১০টি কৃষিপণ্য সংগ্রহকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।


প্রকল্পের বড় ব্যয়ের আরেকটি খাত হলো বিভিন্ন ধরনের অনুদান। কমিউনিটি অবকাঠামো ও অকৃষি ব্যবসার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। কৃষি উপকরণ, কৃষি প্রকল্প ও অবকাঠামোর জন্য রাখা হয়েছে আরও ৫৬৩৯ দশমিক ৭ লাখ টাকা বা প্রায় ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। দুই খাতে অনুদানের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিদেশ ও দেশীয় প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ এবং অনুদান—এই কয়েকটি খাতেই ব্যয় হবে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। এর বাইরে অফিস সরঞ্জাম ও যানবাহন কেনার জন্যও রয়েছে বড় অঙ্কের বরাদ্দ।


প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অফিস সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় ধরা ১৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। তিনটি জিপ কেনায় প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং ৪১টি মোটরসাইকেলের জন্য প্রায় ১ কোটি ১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কম্পিউটার, ক্যামেরা, আসবাবসহ অন্যান্য সরঞ্জামের জন্যও রয়েছে আলাদা বরাদ্দ।


নতুন প্রকল্পের প্রস্তাবেই আগের একটি প্রকল্পের ব্যর্থতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। প্রকল্প প্রস্তাবনার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ২০টি গ্রামে ‘বার্ড-কোইকা’ প্রকল্পের মাধ্যমে রাস্তা, স্কুল, পানি সুবিধা, কমিউনিটি সেন্টার ও জীবিকা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু বিদেশি অনুদান শেষ হওয়ার পর দুর্বল নজরদারি, স্থানীয় সরকারের কম মালিকানা এবং গ্রাম সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রকল্পটির কার্যক্রম টেকসই হয়নি।


এই অভিজ্ঞতার পরও নতুন প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে ভবন নির্মাণ, বিদেশে প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে আগের প্রকল্পের মতো ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের কার্যক্রমও টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, দারিদ্র্য কমানোর মতো একটি কাজে এত কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে নতুন প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ কতটা জরুরি। কারণ, যে মডেলকে সামনে রেখে এই প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে: সমবায়, স্থানীয় নেতৃত্ব, জনগণের অংশগ্রহণ, কৃষি উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতা—বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমে এসব ধারণা বহু বছর ধরেই বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।


প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের বিষয়ে বার্ডের পরিচালক ড. শেখ মাসুদুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপরও সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা সভায় বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং প্রতিনিধিরা বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চয়েছেন। কমিশন যতক্ষণ পর্যন্ত জাস্টিফায়েড মনে না করবে, ততক্ষণ পজিটিভ হবে না। পরিকল্পনা কমিশন থেকে আসা পর্যবেক্ষণগুলোর আলোকেই প্রকল্প পুনর্গঠন করে পাঠানো হবে।