ডিএনএন ডেস্ক: বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হওয়া সম্পর্ক একসময় গড়ায় প্রেমে, পরে বিয়েতে। দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব, পারিবারিক ব্যস্ততা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রামের মধ্যেও থেমে থাকেননি তারা। একে অপরের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে এগিয়ে গেছেন লক্ষ্যের পথে। অবশেষে সেই অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি মিলেছে একসঙ্গেই। ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় কৃষি বিপণন কর্মকর্তা (সহকারী পরিচালক) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন নাটোরের শাহাজ উদ্দীন বাদল ও তার স্ত্রী জেরিন স্বর্ণা।
একই ক্যাডারে স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাদের এই অর্জন শুধু দুই পরিবারের জন্যই নয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সহপাঠী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছেও গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে।
শাহাজ উদ্দীন বাদলের বাড়ি নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী। অন্যদিকে, জেরিন স্বর্ণার বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায়। তিনিও শিক্ষাজীবনে ছিলেন সমান মেধাবী ও স্বপ্নবাজ।
স্বজনরা জানান, তারা দুজনই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। একই বিষয়ে পড়ালেখা করতে গিয়ে তাদের পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে সেই পরিচয় গভীর বন্ধুত্বে রূপ নেয়। সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব পরিণত হয় ভালোবাসায়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হওয়ার পর পারিবারিক সম্মতিতে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
বিয়ের পর অনেকের জীবনেই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দায়িত্ব বেড়ে যায়। অনেক সময় স্বপ্নগুলোও পিছিয়ে পড়ে। বাদল ও জেরিনের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটি। সংসারের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়ার পাশাপাশি তারা নিজেদের লক্ষ্যও সমানভাবে ধরে রেখেছেন। একজন যখন ক্লান্ত হয়েছেন, অন্যজন তাকে সাহস জুগিয়েছেন। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে একে অপরের সহযোগী হয়েছেন এবং কঠিন সময়েও লক্ষ্য থেকে সরে যাননি।
দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক প্রস্তুতি, কঠোর অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ফল হিসেবে সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের সুপারিশপ্রাপ্তদের তালিকায় কৃষি বিপণন কর্মকর্তা (সহকারী পরিচালক) পদে দুজনেরই নাম এসেছে। একই ফলাফলে স্বামী-স্ত্রীর নাম দেখতে পেয়ে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে ওঠে।
তাদের এই অর্জনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সহপাঠীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দন জানিয়ে লিখছেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক জুটিগুলোর একটি আজ তাদের স্বপ্ন পূরণ করেছে। শিক্ষকরা তাদের অধ্যবসায় ও সাফল্যের প্রশংসা করে ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন।
স্বজনরা বলছেন, বাদল ও জেরিন কখনোই সহজ পথে সাফল্য অর্জনের কথা ভাবেননি। তারা নিয়মিত পড়ালেখা করেছেন, সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছেন এবং একে অপরকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। সেই কারণেই আজ তারা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছেন।
এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল হাকিম ও ফরমাজ আলী জানান, বাদল-জেরিনের এই সাফল্যে তারা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। গ্রামের একজন ছেলে নিজের মেধা ও পরিশ্রমে বিসিএস ক্যাডার হয়েছে, এটি তাদের এলাকার তরুণদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে সফল হওয়া বিরল একটি অর্জন।
শাহাজ উদ্দীন বাদল বলেন, “এই সাফল্যের পেছনে মহান আল্লাহর অশেষ রহমত, বাবা-মায়ের দোয়া, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং আমার স্ত্রীর অকুণ্ঠ সহযোগিতা রয়েছে। আমরা দুজনই নিয়মিত পরিকল্পনা করে পড়ালেখা করেছি। কখনো একজন হতাশ হলে অন্যজন সাহস দিয়েছি। এই অর্জন আমাদের দুজনের যৌথ পরিশ্রমের ফল। ভবিষ্যতে দেশের কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে চাই।”
বাদলের চাচা হজরত আলী বলেন, “ছোটবেলা থেকেই বাদল খুব মেধাবী ও পরিশ্রমী ছিল। ওর সাফল্যে আমরা পরিবারের সবাই আনন্দিত। তার স্ত্রীও বিসিএস ক্যাডার হওয়ায় আনন্দ আরো বেড়ে গেছে। আমরা তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি এবং আশা করি, তারা দেশের সেবায় সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে।”