ডিএনএন ডেস্ক: ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য অধিগ্রহণ করা সরকারি জমিতে নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটের বাতিল বরাদ্দ ফিরে পেতে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছেন বরাদ্দপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তাধীন এবং হাইকোর্ট বিভাগে মামলা বিচারাধীন থাকায় আবেদনের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন ও হাইকোর্টের রায়ের আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য উত্তরা দিয়াবাড়ীতে অধিগ্রহণ ৪০ একর জমির মধ্যে ১ দশমিক ১৫ একর জায়গায় সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘পদ্মা’, ‘মেঘনা’, ‘যমুনা’ ও ‘কর্ণফুলী’ নামের চারটি ভবন নির্মাণ শুরু করা হয়। অভিযোগ ওঠে, নিজেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এসব ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা বলা হলেও প্রভাবশালী সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেখানে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, সহকারী একান্ত সচিব ও ঘনিষ্ঠজনও বরাদ্দ পান। তৎকালীন সেতু সচিবের দেহরক্ষী হিসেবে কর্মরত একজন পুলিশ সদস্যকেও ফ্ল্যাট দেওয়া হয়।
প্রতিটি ১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের দাম নির্ধারণ করা হয় মাত্র ৬০ লাখ টাকা। বিষয়টি সামনে আসার পর ২০২৫ সালের ১৫ জুন বনানীর সেতু ভবনে অভিযান চালায় দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করে। প্রাথমিক তদন্তে উদ্যোগটিকে ‘অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূত’ হিসেবে চিহ্নিত করে দুদক। ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও সচিবসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য ওই জমিতে সরকারি অর্থে কেন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তোলে সংস্থাটি।
অভিযানের পর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দুদক জানায়, সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্পের আওতায় পুনর্বাসন ভিলেজ নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা ৪০ একর জমির মধ্যে ১ দশমিক ১৫ একরে চারটি ভবনে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ২৮০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। জমিটি প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত ছিল।
পরে বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে ফ্ল্যাট নির্মাণ ও হস্তান্তর কার্যক্রম স্থগিত রাখতে সেতু বিভাগকে নির্দেশ দেন অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত বছরের ২১ আগস্ট সেতু কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভায় নির্মাণাধীন ২৭০টি ফ্ল্যাটের সাময়িক বরাদ্দ বাতিল করা হয়। ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তসংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিয়মবহির্ভূতভাবে ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বরাদ্দের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বরাদ্দপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। পাশাপাশি তারা উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করেন। আবেদনে তাদের দাবি, অধিকাংশ বরাদ্দপ্রাপ্তের নামে ঢাকা শহরের ৩২ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনো সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেই। দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগের পর বরাদ্দ বাতিল হওয়ায় তারা সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রতিকার পেলে রিট প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন আবেদনকারীরা।
গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ১১৭তম বোর্ড সভায় পুনর্বিবেচনার আবেদন নিয়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সভায় জানানো হয়, সরকারি নির্দেশনা ও জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা, ২০১৬-এর আলোকে সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট নিরসনে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। ১০৬তম ও ১০৭তম বোর্ড সভায় নির্মিতব্য ফ্ল্যাট দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত ও নীতিমালা অনুমোদন করা হয়েছিল। একটি পত্রিকায় বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশের পর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১১৫তম বোর্ড সভায় ২৭০টি সাময়িক বরাদ্দ বাতিল করা হয়। বর্তমানে প্রকল্পটির প্রায় ৪৮ শতাংশ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
সভায় সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক ও সদস্য সচিব মোহম্মদ আবদুর রউফ পুনর্বিবেচনার আবেদন ও আবেদনকারীদের বক্তব্য তুলে ধরেন। লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিষয়টি দুদকে তদন্তাধীন এবং হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন চলমান। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন বলেন, দুদকের তদন্ত ও হাইকোর্টের মামলার নিষ্পত্তির পর বিষয়টি বিবেচনা করা সমীচীন হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সেতু কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলার রায়ের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সার্বিক আলোচনা শেষে একই সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহম্মদ আবদুর রউফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয় দিয়ে বার্তা পাঠানো হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।