৪ কার্তিক, ১৪৩৩
১৯ অক্টোবর, ২০২৬

হামের রোগী বেড়েছে ৭৫ গুণ

Admin Published: March 31, 2026, 12:13 pm
হামের রোগী বেড়েছে ৭৫ গুণ

ডিএনএন ডেস্ক: শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা ছয়টি মূল কারণকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়া, স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, অর্থায়ন সংকটে সেক্টর কর্মসূচি স্থগিত, ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক বিতরণ না হওয়া এবং প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকা।বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এসব কারণ মিলিত হওয়ায় সংক্রমণ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তারা দ্রুত গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং আক্রান্ত শিশুদের পৃথক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হাম শনাক্ত হয়েছে ৬৭৬ শিশুর শরীরে। গত বছর এই সময়ে হাম আক্রান্ত রোগী ছিল ৯ জন। এর আগে ২০২৪ সালের এই সময়ে আক্রান্ত রোগী ছিল ৬৪ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম তিন মাসে রোগী বেড়েছে ৭৫ গুণ। আর ২০২৪ সালের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১১ গুণ। দেশের আট বিভাগে শনাক্ত হামের রোগীর এমন তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে রোগটিতে কত শিশু মারা গেছে, তার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এর আগে ২০২৫ সালে সারাদেশে হাম আক্রান্ত হয়েছিল ১২৫ জন। 


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি ২৪৫ জন হাম আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে; যা মোট রোগীর ৩৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। এরপর রাজশাহী বিভাগে ১৩৭ জন বা ২০ দশমিক ২৬ শতাংশ। চট্টগ্রামে ৯৩ জন বা ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ময়মনসিংহে ৮০ জন বা ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। বরিশাল ও খুলনায় ৫১ জন বা ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ করে। সিলেটে ১৩ জন বা ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। রংপুর বিভাগে ছয়জন বা ০.৮৮ শতাংশ হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শুধু সরকারি হাসপাতালের তথ্য দিয়েছে। এর বাইরে অনেকেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে যা তথ্য নেই অধিদপ্তরের কাছে।


এদিকে বিভিন্ন হাসপাতালের বরাত দিয়ে পাঠানো সমকাল প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ৪১ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদের হামের উপসর্গসহ অন্যান্য জটিলতা ছিল বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ১৫ জন,  বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ছয়, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে চার এবং রাজশাহী, পাবনা ও গোপালগঞ্জে একজন করে শিশু মারা গেছে।  এ ছাড়া বরিশালে এক, বরগুনায় তিন, ভোলায় দুই এবং ঝালকাঠিতে দুজন হামের উপসর্গ নিয়ে আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে।


দেশের হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় গতকাল জাতীয় টিকাদান কারিগরি পরামর্শক দল (নাইটেগ) হামের টিকা দেওয়ার বয়স ছয় মাসে নামানোর সুপারিশ করেছে। কারণ সাম্প্রতিক সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের এক-তৃতীয়াংশ ৯ মাসের কম বয়সী, যা বর্তমান টিকাদানের বয়সসীমার বাইরে।


স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন গতকাল সচিবালয়ে বলেন, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য হামের টিকা দেওয়া হবে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে, যা সম্ভবত জুন বা জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত হবে। এই কর্মসূচিতে দুই কোটি শিশুর টিকা দেওয়া হবে। এই বিশেষ কর্মসূচিতে ছয় মাসের শিশুরাও টিকা পাবে। তবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ ও ১৫ মাস বয়সের শিশুদের দুই ডোজ টিকা দেওয়ার নিয়ম আগের মতোই থাকবে। 


সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ সমকালকে বলেন, বিশেষ কর্মসূচি সাধারণত প্রতি ছয় বছর পরপর নেওয়া হয়; সর্বশেষ ২০২০ সালে ডিসেম্বর করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের পরিকল্পিত বিশেষ কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কার্যকর করা যায়নি। গত বছর গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘটের কারণে নিয়মিত টিকাদান অন্তত তিনবার ব্যাহত হয়েছে। অর্থায়ন সংকটে সেক্টর কর্মসূচি স্থগিত থাকায় টিকাদান কার্যক্রমে বিভ্রাট সৃষ্টি হয়েছে। নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক বিতরণও হয়নি, যা শিশুদের পুষ্টির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত; অপুষ্ট শিশুরা হামে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।


মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সিয়াম মোয়াজ্জেম বলেন, যেসব শিশু এখনও টিকা নেয়নি, বিশেষ করে ১৫ মাসের কম বয়সী শিশু বা যারা এক বা দুই ডোজ টিকা থেকে বঞ্চিত, তাদের মধ্যে হামের সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া অপুষ্টি বা কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা শিশুরা আরও ঝুঁকিতে থাকে। বুকের দুধ পান করলে শিশুর শরীরে মায়ের কাছ থেকে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক। তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা সমানভাবে কার্যকর হয় না। তিনি আরও বলেন, যেসব শিশু ‘এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং’ পায়নি বা পুষ্টিহীন, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে। ফলে এসব শিশুর হামে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক হালিমুর রশীদ বলেন, প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকে, ফলে কয়েক বছর পরপর হামের প্রাদুর্ভাব চক্রাকারে ফিরে আসে। 

টিকাদান কর্মসূচি ও শিশুদের পৃথক চিকিৎসা নিশ্চিত করা না হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমী বলেন, হাম নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। কারণ উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের মধ্যে ২০ শতাংশের নমুনায় হামের জীবাণু মিলছে। এসব রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিতে সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


রামেকে হামে আরও এক শিশুর মৃত্যু

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের সংক্রমণে চিকিৎসাধীন এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি মাসে সোমবার পর্যন্ত ২৯ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান শাহিদা ইয়াসমিন। উপসর্গসহ আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ২৭০ জন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত আড়াই মাসে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ৫৩ শিশু আইসিইউ সংকটে মারা গেছে, যার মধ্যে মাত্র দুই সপ্তাহে (১০-২৪ মার্চ) ৪৪ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। পরীক্ষা শেষে ৩৫ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ছয় থেকে ৯ মাস বয়সী শিশু বেশি, যার মধ্যে ৬০ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছে ছয় মাসের আগে। 

হাসপাতালটি গতকাল পরিদর্শন করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার জটিলতা এবং গত এক-দেড় বছরের আন্দোলনের কারণে টিকা কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। এর প্রভাবেই এই প্রাদুর্ভাব।

তিনি আরও বলেন, সরকারকে অবশ্যই নজর দিতে হবে, টিকাদান কর্মসূচি কীভাবে সফল করা যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। চার মাসের শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তাই ৯ মাসের আগে সংক্রমণের কারণ নিয়ে গবেষণার দিকে দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। 


বগুড়ায় শিশু কম আক্রান্ত

বগুড়ায় হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা কম। গত ১০ দিনে মাত্র চার শিশু শনাক্ত হয়েছে। বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে তাদের আলাদা আইসোলেশনে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ হওয়ার পর তিনজনকে ছাড়া হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে এক শিশু চিকিৎসাধীন। 

হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মঞ্জুর এ মাওলা জানিয়েছেন, গত ১০ দিনে হামে আক্রান্ত চার শিশুর সবাইকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। 


দক্ষিণাঞ্চল

ঈদের পর বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় হামে আক্রান্ত সাত শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে বর্তমানে হাম সন্দেহভাজন ২৮ শিশু চিকিৎসাধীন। বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০৬ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে; ৭৭ শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে, ৪৮ শিশুর হাম ও তিনজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে।

ভোলার কিছু জায়গায় হামের টিকার ঘাটতি আছে, তবে অন্য জেলায় পর্যাপ্ত টিকার সুবিধা রয়েছে।


চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে ৪-৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যদিও তা ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের মিজেলস ব্লকে ১৮ শিশু চিকিৎসাধীন। আক্রান্ত শিশুদের বেশির ভাগই হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে, তবে টিকার আগে এ ধরনের আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ। 


ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের ধারণ ক্ষমতা ২৫ জন হলেও প্রতিদিনই ৫০-৮০ শিশু ভর্তি হয়ে থাকে। সোমবার সন্দেহভাজন দুজন হামের রোগী ভর্তি হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার জন্য সিভিল সার্জন কার্যালয় ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। 

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী বলেন, অন্যান্য জ্বর ও ঠান্ডাজনিত রোগের চাপও বেশি। জেলা সিভিল সার্জন ডা. নোমান মিয়া জানিয়েছেন, হামের টিকার কোনো সংকট নেই এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।


কুমিল্লা

চলতি মার্চ মাস থেকে কুমিল্লায় হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলার ৩১ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকায় রেফার হয়েছে। হাসপাতালের শিশু বিভাগে আলাদা ওয়ার্ডে ২৫ শিশু হামের চিকিৎসা নিচ্ছে। কিছু শিশু পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন পায়নি। জেলা সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশীর জানিয়েছেন, টিকার স্বল্পতা থাকলেও বড় সংকট নেই।


যশোর

যশোরে আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশের বয়স ৯ মাসের কম, যারা নিয়মিত টিকা গ্রহণের আগে আক্রান্ত হচ্ছে। সম্প্রতি ৮৯টি স্যাম্পল পরীক্ষার মধ্যে ২১টি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে শিশুদের পৃথকভাবে রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন।


নওগাঁ

নওগাঁ জেলায় ৩৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যেখানে ছয় শিশুর শরীরে হাম-রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। শিশুদের জন্য জেলা সদর হাসপাতালসহ প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মে মাসে সারাদেশে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে এমআর টিকার বুস্টার ডোজ প্রদান করা হবে।


পটুয়াখালী

পটুয়াখালীতে চলতি মার্চ মাসে ৩১ শিশুর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২ জন হাসপাতালে ভর্তি। টিকার যথেষ্ট সরবরাহ রয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সম্প্রতি দেওয়া হয়নি, যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)