৩ কার্তিক, ১৪৩৩
১৮ অক্টোবর, ২০২৬

ক্লান্তিহীন, অদম্য একজন সেলিনা আখতার

Admin Published: October 24, 2025, 12:07 pm
ক্লান্তিহীন, অদম্য একজন সেলিনা আখতার

স্টাফ রিপোর্টার: পরিশ্রম,অধ্যবসায় আর কর্মদক্ষতায় নারীরা এগিয়েছে সবখানে তার আরেক প্রমাণ সেলিনা আখতার। ঘর-সংসার আর নিজ দফতর সযত্নে সামলে নিরলসভাবে জনসেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। যেন কোনো ক্লান্তি নেই এই অদম্য নারী কর্মকর্তার। ইতিমধ্যেই আলোচনায় এসেছেন জনসেবায় আর নিজের কর্মদক্ষতার মাধ্যমে। 


সেলিনা আখতার রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছেন একটি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে। তাঁর সাহসিকতা ও প্রশংসা ছড়িয়েছে উপজেলা জুড়ে। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালে দুর্গাপুর উপজেলায় আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন সেলিনা আখতার। নিজ দফতরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিষয়ে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ লোকজনের মাঝে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পজিটিভ ধারণা তৈরি করেন অল্পদিনের মধ্যেই। 

এদিকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর উপজেলার পানানগর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের নির্দেশে তাঁকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন এটি। ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব পাবার পর নিজ দফতরের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদেও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি। 

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে সেলিনা আখতারের কর্ম ব্যস্ততা দেখা যায়। ইউনিয়ন পরিষদে দেখা যায় নাগরিক সেবা দিতে। নাগরিকত্ব সনদ, ওয়ারিশ সনদসহ পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছেন সেবা গ্রহীতা ও ভুক্তভোগীদের। আসলাম হোসেন নামের এক সেবা গ্রহীতা জানান, তাঁর ছেলের জন্ম নিবন্ধন করার জন্য পরিষদে এসেছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেবা পেয়েছেন। 


বিলকিস বেগম নামের এক বিধবা জানান, চার বছর আগে তাঁর স্বামী মারা গেছেন। ভাতার তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য দুই বছর ধরে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে ধর্ণা দিয়েছেন, আশ্বাস মিললেও ভাতাভুক্ত হতে পারেননি। তবে কয়েকমাস আগে এই ম্যাডাম (সেলিনা আখতার) এসে নাম তালিকাভুক্ত করেছেন। 

জীবন মাহমুদ নামের একজন বলেন, “১৫ টাকা কেজির চালের জন্য নাম উঠাবার চেষ্টা করিচি, পারিনি। আপা চিয়ারমেন (প্রশাসক) হওয়ার পর পাইচি।” পানানগরের আব্বাস আলী ও মহররম মিজি বলেন, টেকা না দিলে ভাতা হবে না বুলেচ, তবে  নতুন প্রশাসক আসার পরেই সহজে পেয়েছেন। 

পানানগর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য শাকিলা বেগম বলেন, প্রশাসক আপার সঙ্গে কোনো চাপ ছাড়াই কাজ করছেন। তিনি নিয়মিত গ্রাম আদালত পরিচালনা করে সমস্যার সমাধান করা ছাড়াও সবাইকে নিয়ে ভালোভাবে পরিষদ চালাচ্ছেন। একই রকম কথা বলেছেন পরিষদের সদস্য হাসানসহ অন্যরা। এছাড়াও নিজের দফতরের কাজ করেন সমানতালে। সহকর্মীরা জানান, নিয়মিত দাফতরিক কাজ করেন তিনি। এবার দুর্গাপূজার নিরাপত্তার জন্য বাহিনীর সদস্যদের নির্বাচিত করা ছাড়াও সুষ্ঠু ভাবে পূজা উদযাপনের জন্য বাহিনীর পক্ষে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন ও দিক নির্দেশনাও দেন। 

সেলিনা আখতার বলেন, সংসার সামলানোর পর নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের চেষ্টা করেন। ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনও আনন্দের সঙ্গে নিয়েছেন। এই দায়িত্বে জনগণের সেবা করার সুযোগ বেশি থাকে। 

অল্প সময়ে সরকারি বরাদ্দের সঠিক বণ্টন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন সহকর্মী সদস্যদের নিয়ে। তিনি জানান, নিজ দফতর ও  অতিরিক্ত ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব পালন শেষে প্রায়ই দিনই সন্ধ্যা হয়ে যায়। নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও এই সেবার মাধ্যমে তৃপ্তি পান বলে জানান।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিয়মিত গ্রাম আদালত পরিচালনা করে ছোটখাটো সমস্যার সমাধান করেন এই কর্মকর্তা। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পুরো বন্ধ থাকা গ্রাম আদালত সচল করেন তিনি। রজুফা নামের এক নারী জানান, গ্রাম আদালতের মাধ্যমে পারিবারিক সমস্যার সমাধান পেয়েছেন। এখন সুখেই আছেন স্বামী গৃহে। শুধু তিনি একা নন এরকম সমাধান পেয়েছেন অনেকে। ময়েন উদ্দিন নামের কৃষক বলেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে জমিজমা নিয়ে বিরোধ ছিল। গ্রামে একাধিকবার বসেও সমাধান হয়নি। শেষে চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ দিয়ে গ্রাম আদালতের মাধ্যমে সুষ্ঠু সমাধান পেয়েছেন। এসব কারণে জনবান্ধব হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা শারমিন  বলেন, একজন সেলিনা আখতার একজন নারী হয়েও দাফতরিক কাজের পাশাপাশি ইউপির প্রশাসক হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দক্ষতা ও যোগ্যতায় নিজেকে একজন জনবান্ধব হিসেবে পরিচিত করেছেন।

প্রসঙ্গত, সেলিনা আখতার নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার বসিন্দা। বিএ পাশ করার পর ২০১০ সালে তিনি চাকরিতে প্রবেশ করেন। দুই মেয়ে রয়েছে তার। তারা স্কুলে লেখাপড়া করছে। তাদের দেখাশুনা, সংসার সামলানোর পাশাপাশি নিজের দফতরের দায়িত্ব পালন ছাড়াও এখন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্বে নিয়োজিত। সব কিছু আনন্দের সঙ্গেই পালন করছেন তিনি।