২ কার্তিক, ১৪৩৩
১৭ অক্টোবর, ২০২৬

কৃষিতে শ্রমিক সংকট,বাড়ছে উৎপাদন খরচ

Admin Published: October 7, 2026, 5:39 pm
কৃষিতে শ্রমিক সংকট,বাড়ছে উৎপাদন খরচ

নুরুজ্জামান,বাঘা : রাজশাহী অঞ্চলে কৃষিতে শ্রমিকের সংকট ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে কৃষিকাজে যুক্ত শ্রমিকদের একটি অংশ বেশি ও নিয়মিত আয়ের আশায় অটোরিকশা, সিএনজি, ব্যাটারিচালিত ভ্যান-সহ বিভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছেন। ফলে মৌসুমি কৃষিকাজের সময় শ্রমিকের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বড় ব্যবধান। এতে বাড়ছে শ্রমিকের মজুরি, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে কৃষকের উৎপাদন খরচ।


কৃষকরা বলছেন, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় ধান রোপণ, ধান কাটা ও মাড়াই, সবজি চাষ এবং ফসল ঘরে তোলার মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা বেশি থাকে। কিন্তু ওই সময় প্রয়োজনের তুলনায় শ্রমিক কম পাওয়া যায়। ফলে বেশি মজুরি দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো শ্রমিক পাওয়া যায় না। এতে ফসল কাটতে দেরি হওয়া বা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।


রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আমোদপুর গ্রামের কৃষক মহাসিন আলী জানান, শীত সমাগত। কতিপয় শ্রমিক খেজুর রস সংগ্রহের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রওনা হচ্ছেন। ফলে শ্রমিকের মজুরি বাড়ার পাশাপাশি তাঁদের খাবার ও যাতায়াতের খরচও অনেক ক্ষেত্রে কৃষককে বহন করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে ফসল উৎপাদনের ব্যয় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যাচ্ছে। অথচ উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে কৃষিপণ্যের বাজারদর সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় কৃষকের লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।


অপর দিকে কৃষি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কৃষিকাজে তাঁদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কাজের অনিশ্চয়তা। মৌসুমি কাজ শেষ হয়ে গেলে দীর্ঘ সময় কাজের সুযোগ থাকে না। অন্যদিকে অটোরিকশা, সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালানোর ক্ষেত্রে প্রতিদিন নিজের স্বধীনতা-সহ বাড়তি আয়ের সুযোগ রয়েছে। ফলে আয় নিশ্চিত করার জন্য অনেক শ্রমিক কৃষিকাজ ছেড়ে পরিবহন খাতে চলে যাচ্ছেন।


অনেকেই বলছেন, শ্রমবাজারে এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু কৃষি খাতের বিষয়ই কাজ করছে না। শিল্প ও কলকারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়া এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নানা কারণে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং গার্মেন্টস কারখানায় কর্মসংস্থান কমেছে। এসব খাত থেকে কাজ হারানো শ্রমিকদের কেউ কেউ গ্রামে ফিরে নির্মাণকাজ, ইটভাটা কিংবা গ্রামীণ পরিবহন খাতে যুক্ত হচ্ছেন।


আবার কর্মসংস্থান হারানো শ্রমিকদের একটি অংশ ঋণ নিয়ে অটোরিকশা বা ব্যাটারিচালিত ভ্যান কিনে নতুন করে জীবিকা শুরু করছেন। তবে ঋণের কিস্তি ও চড়া সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে তাঁদের আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণনির্ভরতার ঝুঁকিও বাড়ছে।


লোকজন বলছেন, শুধু গ্রাম নয়, কৃষি থেকে শ্রমশক্তি অন্য খাতে চলে যাওয়ার প্রভাব শহরাঞ্চলের শ্রমবাজারেও দেখা যাচ্ছে। বাসাবাড়িতে রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কাপড় ধোয়া ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজে শ্রমিকের পারিশ্রমিক বেড়েছে বলে অনেক পরিবার জানিয়েছেন। নিয়মিত শ্রমিক পাওয়া কঠিন হওয়ায় অনেক পরিবারকে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।


এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, কৃষি থেকে শ্রমশক্তির অন্য খাতে চলে যাওয়া অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনেরই অংশ। কৃষির বাইরে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লে শ্রমিকের পেশা পরিবর্তন করাটা স্বাভাবিক। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষির উৎপাদন ব্যবস্থাকেও খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তাঁদের মতে, কৃষিতে শ্রমিকের ঘাটতি মোকাবিলায় আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই। ধান রোপণ, কাটা ও মাড়াই-সহ শ্রমনির্ভর কাজগুলোতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানো গেলে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করাও সম্ভব।


তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কৃষি থেকে শ্রমশক্তি সরে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কৃষিতে শ্রমিক সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এতে শুধু কৃষকের উৎপাদন খরচই বাড়বে না, খাদ্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই শ্রমবাজারে চলমান পরিবর্তনকে বিচ্ছিন্ন ভাবে না দেখে কৃষি, শিল্প ও পরিবহন খাতের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সমন্বয় করে নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।


এদিকে কৃষকরা আক্ষেপ করে বলছেন, কৃষিকে টেকসই রাখতে শুধু ফলন বাড়ানোর উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। কৃষিকাজে শ্রমিকের প্রাপ্যতা, মজুরি, যান্ত্রিকীকরণ এবং উৎপাদন খরচ-সব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সময়মতো প্রয়োজনীয় শ্রমিক না পাওয়া এবং উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকলে কৃষকেরা চাষাবাদে আগ্রহ হারাতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়বে দেশের খাদ্য উৎপাদন ও সাধারণ ভোক্তার ওপর।