ডিএনএন ডেস্ক: রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মোটরসাইকেল। হঠাৎ সেটি চালিয়ে রাস্তায় উঠে আসেন চালক। শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি বাস দ্রুতগতিতে আসছিল ওই লেন দিয়ে। মোটরসাইকেল বাঁচাতে গিয়ে রাস্তার পাশে থাকা শ্রমিকদের চাপা দেয় বাসটি। প্রাণ হারান সাতজন। দুর্ঘটনাটি আজ ভোরে ঘটেছে বগুড়া সদরের এরুলিয়ায়।‘সকালে এখানে প্রতিদিনই কামলার (শ্রমিক) বাজার লাগে। আজ কামলাকে নিয়ে এক মোটরসাইকেল চালক রাস্তার ওপর আসছে। আর তখনই বাস সেখানে আসে। ওকে পাশ কাটাতে গিয়ে কারেন্টের খুঁটিতে বাড়ি খায়। এরপর সমানে মানুষেকে পিষে দেয়।’ কথাগুলো বলছিলেন এরুলিয়া গ্রামের মো. মিনু (৫৫)।
আজ শুক্রবার সকালের বাস দুর্ঘটনার সময় তিনি ছিলেন সেখানে। আহতদের উদ্ধার করে পাঠিয়েছিলেন হাসপাতালে। মিনু বলছিলেন, ‘বাস যাচ্ছিল নওগাঁর দিকে। মোটরসাইকেলকে বাঁচানোর জন্য রাস্তার ডানপাশে নামিয়ে দিয়েছে। এরপর ব্রেকও করছে। যার জন্য গাড়ি উল্টো ঘুরে পশ্চিম দিক থেকে পুর্বদিকে চলে আসছে।’
‘আমরা এসে বাসের তল থেকে মানুষের লাশ, আহতদের বের করছি। বেশিরভাগই কামলা-কিষাণ। গোবিন্দগঞ্জ থেকে আসছে কাজের জন্য। এখানে মারা গেছে তিনজন। আর হাসপাতালে যাওয়ার পর চারজন মারা গেছে’- যোগ করেন মিনু।
পুলিশ জানিয়েছে, এরুলিয়া বন্দরে বাসচাপায় নিহত সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই দিনমজুর। অন্য দুজন এসেছিলেন শ্রমিক নিতে। তাদের মধ্যে একজন ওই মোটরসাইকেল চালক মো. বেল্লাল হোসেন।
নিহতরা হলেন, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের এনায়েতপুর গ্রামের আবু সাইদ (৪৫), বইল্লাগ্রামের নুর আলম (৪৫), জয়পুরহাটের কালাইয়ের আনারুল (৫৫), পাঁচবিবির আমিরুল (৪০), দিনাজপুররের পার্বতীপুরের তাজিমুল (৪৫), বগুড়া সদরের ফাপোড়ের বেল্লাল হোসেন (৪৫) এবং কাহালুর নারহট্ট গ্রামের নুর মোহাম্মদ সরদার (৬৭)।
স্থানীয় কয়েক প্রত্যক্ষদর্শী জানালেন দুর্ঘটনার বর্ণনা। তাদের ভাষ্য, মোটরসাইকেল চালক বেল্লাল শ্রমিক নিতে এসেছিলেন। তিনি এক শ্রমিককে তুলেই মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে হুট করে রাস্তার চলে আসেন। তখন ঘটে দুর্ঘটনাটি। পরে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশের সদস্যরা এরুলিয়া এসে মরদেহ উদ্ধার করেন। আহতদের নেন হাসপাতালে।
এরুলিয়া বন্দরের মুদি ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম জানালেন, দুর্ঘটনার সময় তিনি দোকানের ভেতরে ছিলেন। তিনি বললেন, ‘এখানে তো কামলার বাজার বসে। এই রাস্তার দুই ধারে সব লোকজন বসে থাকে। যার যার দরকার দরদাম করে কামলাদের নিয়ে যায়। আজ হঠাৎ বাসটি এসে আমার দোকানের পাশের বিদ্যুতের খুঁটিতে ধাক্কা লাগায়। বাস না থেমে লোকজনের উপর দিয়ে চলতে শুরু করে। ঘটনার পরপর বাসের চালক-হেল্পার পালিয়ে গেছে।’
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত ২২ জন চিকিৎসাধীন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমনের মৌসুম হওয়ায় গোবিন্দগঞ্জের কয়েক গ্রাম থেকে অন্তত ১০০ শ্রমিক এরুলিয়ায় এসেছিলেন কাজের খোঁজে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতেই এসেছিলেন তারা।
জরুরি বিভাগে আহত সাজু মিয়ার চিকিৎসা চলছে। তার বাড়ি গোবিন্দগঞ্জের সাপমারা ইউনিয়নের খামারপাড়া গ্রামে।
সাজু বললেন, ‘আমরা কামলারা সব ভোররাত থেকে বসে আছি। কী হলো, আমরা কিছু বুঝেই উঠতে পারিনি। হঠাৎ গায়ের উপর সব হুড়মুড় করে পড়ল। এরপর দেখলাম আশেপাশে রক্ত, মানুষ পড়ে আছে। পরে লোকজন আমাকে ধরে গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে আসল।’
নিহত শ্রমিক আবু সাঈদের খালাতো ভাই সাকিবুর বললেন, ‘আমার আসার কথা আগামীকাল শনিবার। সাঈদ ও মামাতো বোনের স্বামী আমিরুল একদিন আগেই চলে আসে। এসেই সকালে এই ঘটনা। দুজনেই মারা গেছে।’
গোবিন্দগঞ্জের আল আমিন সরদারের চাচা নুর মোহাম্মদ সরদার এসেছিলেন শ্রমিকের খোঁজে। ‘বড় চাচা জমিতে ধান লাগানোর জন্য ভোরে শ্রমিক নিতে এরুলিয়া এসেছিলেন। এরপর আমরা খবর পাই যে বাসচাপায় তিনি মারা গেছেন। সুস্থ মানুষ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। এখন শুনি তিনি আর নেই’- বলছিলেন আল আমিন।
আহতদের খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে এসেছেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. আ ন ম মনোয়ারুল কাদির বিটু। কথা বলেন নিহতদের পরিবারের সঙ্গেও।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর থেকে আহতদের ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। নিহতদের পরিবারে দেওয়া হবে ৫ লাখ টাকা। এ তথ্য জানিয়ে সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলী বলেছেন, ‘আমরা সাতজন নিহতের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হতে পেরেছি। এর মধ্যে দুজন বগুড়ার। বাকিরা গোবিন্দগঞ্জ ও জয়পুরহাট থেকে কাজের উদ্দেশ্যে এরুলিয়া এসেছিলেন।’
আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। ওসি আরও বলেছেন, হতাহতদের পরিবার থেকে মামলা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশ তদন্ত করবে।