ডিএনএন ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বড় ধরনের পরাজয় ঘটেছে। তবে এ পরাজয় মানতে নারাজ দলটির প্রার্থী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি পদত্যাগ না করার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে যথাসময়ে শপথ অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।রাজ্যে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯৩টির ফল প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি আসন। ফলপ্রকাশের পরও থামেনি তৃণমূল-বিজেপি দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতাসহ চলমান রয়েছে দুই পক্ষের পালটা-পালটি অভিযোগ। কেউ কেউ ভোটের ফল মানতে নারাজ, কেউবা আবার ইতোমধ্যেই করছেন উদ্যাপন।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ফলপ্রকাশের পরদিনই মমতার সমর্থককে কুপিয়ে হত্যা
নির্বাচনে তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ মোট ২২ জন মন্ত্রী নিজেদের আসনে পরাজিত হয়েছেন। যা মোট সংখ্যার প্রায় ৬৩ শতাংশ।
তবে এতে দমে যাননি ভবানীপুরের মেয়ে মমতা। নির্বাচনে হারলেও পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। মমতা জানান, ১০০ আসন জোর করে লুট করা হয়েছে। এসআইআর করে ভোটারদের নাম কাটা হয়েছে। এরকম কোনো ভোটে দেখিনি। আমি ভোটে হারিনি। কেন পদত্যাগ করব। আমরা হারিনি, তাই রাজভবন কেন যাব?
তার বলেন, সব পরিকল্পনা করে করা হয়েছে। ভোটের আগে নির্বাচকদের বদল করা হয়েছে। ভোটের দিন দুয়েক আগেই আমাদের একাধিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এছাড়াও, শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, বিজেপির সমর্থকরা আমার পেটে ও পেছনে লাথি মেরেছে। ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে গেলে আমাকে মারতে মারতে বের করা হয়েছে। যেভাবে আমার উপর অত্যাচার হয়েছে, একজন মহিলা হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে আমি ধারণাও করতে পারি না। প্রথমে আমার গাড়ি থামানো হয়, পরে বুথে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়।
নির্বাচনে হেরেও ‘অন্তর্বর্তীকালীন মুখ্যমন্ত্রী’ হতে পারেন মমতা। সংবিধান অনুযায়ী, রাজ্যপাল বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পদত্যাগের আহ্বান জানাবেন। পাশাপাশি নতুন সরকার শপথ নেওয়া পর্যন্ত তাকে অন্তর্বর্তীকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুরোধ জানানো হতে পারে, যাতে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা
এদিকে, নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পরদিনই তৃণমূল সমর্থক আবির শেখকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার নানুরে ভোট-পরবর্তী সহিংসতায় নিহত হন আবির।
আবিরের পরিবারের অভিযোগ, আবিরকে রাস্তায় একা পেয়ে তার পথ আটকায় দুষ্কৃতকারীরা। এরপর তাকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে ফেলে রাখা হয়।
হামলাকারীরা সবাই আবিরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিজেপির নেতাকর্মী ছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তার পরিবারের সদস্যরা।
চলমান উত্তেজনার মধ্যেই আগামী ৯ মে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে শপথ নিতে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে নবনির্বাচিত ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এই দিনটিকে রাজ্যে একটি ‘নতুন সূচনা’ হিসেবে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
এ অবস্থায় মমতাকে সংবিধান দেখিয়েছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দু বলেন, সবকিছুই সংবিধানে উল্লেখ করা আছে। আমার এই নিয়ে বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই। মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না করার ঘোষণার প্রেক্ষিতে এ কথা বলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত যদি মমতা পদ না ছাড়েন তাহলে তাকে বরখাস্ত করতে পারেন গভর্নর। এ জন্য রাজভবন থেকে জারি করতে হবে একটি বিশেষ অধ্যাদেশ।
ভারতের সংবিধানের ১৭২ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা, যদি তার আগে ভেঙে দেওয়া না হয়। তবে তার প্রথম বৈঠকের জন্য নির্ধারিত তারিখ থেকে পাঁচ বছরের জন্য বলবৎ থাকবে এবং এর বেশি নয় এবং উক্ত পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হলে বিধানসভাটি ভেঙে দেওয়া হবে।
৭ মে সময়সীমার আগে মমতা সিদ্ধান্ত বদল না করলে ভারতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম হবে। কারণ, ভারতে বিভিন্ন রাজ্যে এবং রাজনৈতিক দলে নির্বাচনের পর একাধিকবার ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর বিদায়ি মুখ্যমন্ত্রীরা সরে দাঁড়িয়েছেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছেন।
সার্বিকভাবে নির্বাচনের ফলাফল সুস্পষ্ট হলেও রাজ্যজুড়ে এখনো চলছে উত্তেজনা। দু পক্ষের বিপরীতমুখী অবস্থানের ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না। কবে নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ আবার চিরচেনা রূপে ফিরবে তাও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।