ডিএনএন ডেস্ক: ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সিতে ১৬ বছরের দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে দিলেন নেইমার। বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে তিনি জানিয়েছেন, সেলেসাওয়ের হয়ে তার পথচলা শেষ হয়েছে।তার বিদায়ে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে নতুন প্রজন্মের উত্থানের পথও আরও প্রশস্ত হলো। আর সেই নতুন যুগের নেতৃত্বে সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে।
এর আগে বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের বিদায়ের পর আবেগঘন এক অনানুষ্ঠানিক কথোপকথনে নেইমারকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি চেষ্টা করেছি। এখন সব শেষ।
এখানেই শুরু করেছিলাম, এখানেই শেষ করলাম।’ সেই মন্তব্য সম্প্রচারিত হওয়ার পর তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে জল্পনা শুরু হলেও তিনি এতদিন নীরব ছিলেন।
অবশেষে গত মঙ্গলবার ভেনেজুয়েলার ইউসিভিকে হারিয়ে কোপা সুদামেরিকানার শেষ ষোলো নিশ্চিত করার পর ভিলা বেলমিরোতে সাংবাদিকদের সামনে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
নেইমার বলেন, ‘ব্রাজিল জাতীয় দলে আমার সময় শেষ। আমি ইতিহাস গড়েছি, অসাধারণ অনেক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছি। এই দলের জন্য রক্ত, ঘাম, জীবন, সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। সব সময় লড়েছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আর নয়।’
নেইমারের এই ঘোষণার পর ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) জানিয়েছে, তার বিদায়ী ম্যাচ আয়োজনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে আপাতত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি, কারণ তিনি এখনও পেশাদার ফুটবলে সক্রিয়।
পরবর্তী বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় নেইমারের বয়স হবে ৩৮ বছর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক চোটে ভোগায় তার আর বিশ্বকাপে ফেরা কঠিন বলেই মনে করা হচ্ছে। সর্বশেষ বিশ্বকাপেও ডান পায়ের কাফের দ্বিতীয় মাত্রার চোট কাটিয়ে খেলতে নেমেছিলেন তিনি। ফলে স্কটল্যান্ড ও নরওয়ের বিপক্ষে সীমিত সময় মাঠে নামতে পেরেছিলেন। বিদায়ের ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে একটি পেনাল্টি গোলও করেছিলেন, তবে তখন দল প্রায় ছিটকে গিয়েছিল।
জাতীয় দলের হয়ে ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে নেইমারের সবচেয়ে বড় অর্জন ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া। ৮০ গোল করে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন কিংবদন্তি পেলের রেকর্ড। তবে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেছে।
ব্রাজিলের জার্সিতে তার একমাত্র বড় শিরোপা ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপ। ২০১৯ কোপা আমেরিকা জেতা দলে তিনি ছিলেন না। ২০১৬ রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলকে প্রথমবারের মতো ফুটবলে স্বর্ণপদক জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অলিম্পিক ফুটবল অনূর্ধ্ব ২৩ প্রতিযোগিতা হওয়ায় সেটি পূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয় না।
চারটি বিশ্বকাপে খেলেও কখনো সেমিফাইনালে উঠতে পারেননি নেইমার। ২০১৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে পিঠে গুরুতর চোট পাওয়ায় জার্মানির বিপক্ষে ঐতিহাসিক ৭-১ গোলের পরাজয়ের সেমিফাইনালে খেলতে পারেননি।
মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন, বিভিন্ন বিতর্ক এবং রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেও ক্যারিয়ারজুড়ে সমর্থকদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। কেউ তাকে ব্রাজিলের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ ছিলেন তার কড়া সমালোচক। সর্বশেষ বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দলে তার অন্তর্ভুক্তি নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাকে দলে রাখেন।
তবে বিশ্বকাপ শেষে আনচেলত্তিও স্বীকার করেছেন, ব্রাজিল ফুটবলে একটি যুগের অবসান ঘটেছে।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এই বিশ্বকাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজন্মের সমাপ্তি নির্দেশ করছে। নেইমার, দানিলো, কাসেমিরো, বিশ্বকাপে ৩০ বছরের বেশি বয়সী যেসব খেলোয়াড় ছিল, তাদের একটি অধ্যায় শেষ হয়ে এসেছে।’
নেইমারের বিদায়ের ফলে এখন ব্রাজিল দলের সবচেয়ে বড় তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাচ্ছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। বিশ্বকাপেও তিনি ছিলেন দলের অন্যতম সেরা পারফরমার (৪ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট)। এখন আর তার ওপর নেইমারের ছায়া থাকবে না।
এ ছাড়া নতুন প্রজন্মে কোচ আনচেলত্তির আস্থার তালিকায় রয়েছেন এস্তেভাও, এন্দ্রিক ও রায়ানের মতো তরুণ ফুটবলাররা। চোটের কারণে সর্বশেষ বিশ্বকাপ খেলতে না পারলেও এস্তেভাওকে ব্রাজিল ফুটবলের ভবিষ্যৎ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে নেইমারের ক্লাব ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। সান্তোসের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন, অন্য কোনো ক্লাবে যোগ দেওয়া, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাবগুলোর আগ্রহের কথাও শোনা যাচ্ছে, অথবা অবসর, সব সম্ভাবনাই খোলা থাকলেও এখন পর্যন্ত তিনি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি।