নুরুজ্জামান : সীমান্ত মানেই কাঁটাতারের বেড়া নয়। সীমান্ত মানে মানুষের জীবন, নদী, চর, কৃষকের ঘাম, শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্ন আর দুই দেশের মাঝখানে টিকে থাকার এক কঠিন বাস্তবতা । সেই সীমান্তের বুক চিরেই কখনো কখনো চলে যায় কিছু পণ্য-বৈধ পথে নয়, অন্ধকার পথে। আমরা তাকে বলি চোরাচালান। পদ্মার কোল ঘেষে গড়ে উঠা রাজশাহীর বাঘা উপজেলা এরমধ্যে অন্যতম ।
অনেক বছর আগে রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট কিংবা চাঁপাইন বাবগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় গেলে অন্যরকম এক দৃশ্য চোখে পড়ত। সাইকেলের সারি, নৌকার আনাগোনা, মাথায় কিংবা কাঁধে বোঝা নিয়ে ছুটে চলা মানুষ। কোথাও শাড়ি, কোথাও চিনি, লবণ কিংবা সিগারেট এবং একসঙ্গে আনা গরুর বহর । সন্ধ্যা নামলেই সীমান্তের কোনো কোনো পথ যেন বদলে যেত। তবে সেই দিনগুলো অনেকটা পেছনে পড়ে গেছে। কিন্তু চোরাচালান বন্ধ হয়নি।
বরং সে নিজেকে বদলে নিয়েছে সময়ের সঙ্গে। পুরোনো সাইকেল-নৌকার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে মোবাইল ফোন, ডিজিটাল যোগাযোগ, আধুনিক পরিবহন ও নতুন নতুন কৌশল। পণ্যের তালিকাতেও এসেছে পরিবর্তন। মাদক, স্বর্ণ, অস্ত্র, দামি মদ,হিরোইন, ফেন্সিডিল ও গাঁজা থেকে শুরু করে মানুষ পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধও এখন সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধের বড় অংশ।এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শঙ্কার জায়গাটি হল মাদক।
বাঘা সীমান্ত এলাকার লোকজন জানান, একটি ছোট্ট বোতল ফেনসিডিল কিংবা কয়েকটি মাদক বড়ির পেছনে আমরা হয়তো শুধু একজন বাহককে দেখি। কিন্তু সেই বাহকের পেছনে থাকে আরও অনেক বড়-বড় হাত। থাকে সরবরাহকারী, দালাল, মজুতদার, পরিবহনকারী, অর্থদাতা এবং শেষ পর্যন্ত একজন ক্রেতা। অর্থাৎ সীমান্তে যে হাতটি ধরা পড়ে, সেটিই সব সময় অপরাধের আসল হাত নয়।
রাজশাহীর সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল-সহ বিভিন্ন মাদক উদ্ধারের ঘটনা আমাদের বারবার সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। একটি চালান আটক হওয়ার খবর হয়তো একদিনের সংবাদ। কিন্তু সেই চালান যে তরুণটির হাতে পৌঁছানোর কথা ছিল, তার জীবনে এর প্রভাব হতে পারে সারাজীবনের।
আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় এখানেই। একজন তরুণ যখন মাদকের কাছে হেরে যায়, তখন শুধু একজন মানুষ হারায় না-হারায় একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। তার মায়ের চোখের ঘুম ও বাবার বুকের ভরসা । ভাই-বোনের নিরাপত্তাবোধ হারায়। আর ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ। চোরাচালানের পেছনে তাই শুধু অর্থের লোভ নয়, আছে আমাদের সামাজিক দুর্বলতাও।
সীমান্তের কোনো দরিদ্র যুবক যখন কাজ না পেয়ে কয়েকশ টাকার বিনিময়ে একটি বোঝা বহন করতে রাজি হয়, তখন তার অপরাধের সঙ্গে আমাদের সামাজিক দায়ও প্রশ্নের মুখে পড়ে ? যে দেশে একজন তরুণের সামনে বৈধ আয়ের দরজা বন্ধ থাকে, সেখানে অপরাধীর প্রলোভনের দরজা খুলে দেওয়া খুবই সহজ।
তাই চোরাচালান বন্ধ করতে হলে সীমান্তে শুধু পাহারা বাড়ালেই হবে না, মানুষের জীবনেও আলো বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বৈধ আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। আরেকটি অন্ধকার অধ্যায় হল মানুষ পাচার। বিদেশে ভালো চাকরি, ভালো বেতন কিংবা উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে কত মানুষ যে দালালের হাতে সর্বস্ব তুলে দেন, তার হিসাব হয়তো কোনো পরিসংখ্যানের পাতায় পুরোপুরি ধরা পড়ে না। কারও জমি বিক্রি হয়, কারও ঘর বন্ধক পড়ে, কেউ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পাড়ি দেন অজানা দেশে। তারপর কোনো একদিন জানতে পারেন-যে স্বপ্নের জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন, সেটি ছিল প্রতারণার ফাঁদ।
চোরাচালানের আরেকটি দিক আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। সেটি হল ক্রেতা। অবৈধ পণ্য কেউ না কিনলে সেই বাজার টিকবে না। আমরা যখন জেনেশুনে কর ফাঁকি দিয়ে আনা পণ্য কিনি, তখন অজান্তেই সেই অপরাধের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করি। বিদেশি পণ্য মানেই ভালো-এই মানসিকতা থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। তবে শুধু মানুষের সচেতনতা দিয়ে এই অন্ধকার দূর হবে না। প্রয়োজন রাষ্ট্রের শক্ত ও নিরপেক্ষ ভূমিকা।
চোরাচালানের বিরুদ্ধে অভিযান হতে হবে শুধু বাহক ধরার অভিযান নয়, ধরতে হবে মূল হোতাদের। খুঁজে বের করতে হবে অর্থের উৎস। দেখতে হবে কারা এই ব্যবসা থেকে লাভবান হচ্ছে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সীমান্ত নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-আইনের রক্ষক যদি কখনো অপরাধের সঙ্গে আপস করেন, তাহলে তাকেও আইনের মুখোমুখি করতে হবে।কারণ একটি দুর্বল জায়গা দিয়ে শুধু একটি চালান ঢোকে না , ঢুকে পড়ে একটি অপরাধচক্র।
অনেক বছর আগে সীমান্তের পথে দাঁড়িয়ে চোরাচালানের যে দৃশ্য দেখেছি, আজ তার অনেকটাই বদলে গেছে। কিন্তু একটি বিষয় বদলায়নি-অবৈধ বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই।কেউ হারায় সন্তানকে মাদকের কাছে।কেউ হারায় সঞ্চিত অর্থ প্রতারক দালালের কাছে। কেউ হারায় বৈধ ব্যবসার সুযোগ। আর রাষ্ট্র হারায় রাজস্ব, সম্পদ ও মানুষের আস্থা। তাই চোরাচালান শুধু সীমান্তের সমস্যা নয়। এটি আমাদের ঘরের সমস্যা, আমাদের সমাজের সমস্যা, আমাদের ভবিষ্যতের সমস্যা।
সীমান্তের ওপারে শুধু পণ্য যায় না-কখনো কখনো চলে যায় আমাদের তরুণের স্বপ্ন, পরিবারের সঞ্চয়, দেশের সম্পদ এবং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। সেই পথটি বন্ধ করতে হবে। কাঁটাতারের ওপারে যেমন সীমান্ত রক্ষা করতে হবে, তেমনি সীমান্তের এপারেও রক্ষা করতে হবে মানুষকে, মাটিকে এবং দেশের ভবিষ্যৎকে। এই লড়াই শুরু হোক সীমান্ত থেকে-আর পৌঁছে যাক প্রতিটি মানুষের বিবেকের দরজায়।