বিশেষ প্রতিবেদক : একসময় যে পাটকে বলা হতো বাংলাদেশের ‘সোনালি আঁশ’, সেই পাটই একপর্যায়ে কৃষকের কাছে হয়ে উঠেছিল অনিশ্চয়তার ফসল। উৎপাদন খরচ বাড়লেও কাঙ্খিত দাম মিলত না। পাটকল বন্ধ হওয়া, বাজারের অস্থিরতা ও পাটজাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির অভাবে কৃষকের আগ্রহ কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিকের বিকল্প খোঁজা হচ্ছে। বাড়ছে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার। এর সঙ্গে এবার বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন রাজশাহীর পাটচাষিরা। এবার মৌসুমের শুরুতেই পাটের বাজারদরে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠেছে কৃষকদের মৃখে। রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা হাটে প্রতি মণ পাট বিত্রি হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার টাকা দরে।
রাজশাহী অঞ্চলের মাঠে মাঠে এখন সবুজ পাটের কারবার। কোথাও কৃষক পাট কাটছেন, কোথাও আঁটি বেঁধে জাগ দেওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। আবার কোথাও পুকুর, ডোবা কিংবা জলাশয়ের পানিতে পাট জাগ দিয়ে আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত শ্রমিকরা। কেউ সেই আঁশ ধুয়ে রোদে শুকাচ্ছেন। পাটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ব্যস্ততা এখন গ্রামবাংলার চেনা দৃশ্য।
রাজশাহীর নওহাটা হাটে পাট বিক্রি করতে আসা পবা উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামের কৃষক বাবলু আহমেদ বলেন, ‘এবার পাটের দাম ভালো। পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম পাট করেছি। প্রতি বিঘায় প্রায় ১২ মণ করে পাট হয়েছে। খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ থাকবে। এই দাম থাকলে পাট চাষ করে কৃষকরা আবারও আগ্রহী হবেন।’
পাট ব্যবসায়ী জানিপ হোসেনের চোখেও এবারের বাজারের চিত্র আলাদা। তাঁর ভাষ্য, গত বছর মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা দরে কেনা হয়েছিল। এবার মৌসুমের শুরুতেই সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা দরে পাট কিনতে হচ্ছে। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার পাটের দাম কিছুটা বেশি।
তবে এই ভালো দামের আড়ালেও আছে কৃষকের হিসাব-নিকাশ। পবা উপজেলার বড়গাছী ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল আলীম এক বিঘা জমিতে পাট চাষে খরচ করেছেন প্রায় ২০ হাজার টাকা। এবার তাঁর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১০ থেকে ১২ মণ পাট। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ১০ মণ পাট ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হলে খরচ বাদে লাভ থাকে প্রায় ২০ হাজার টাকা।
আব্দুল আলীম বলেন, ‘এবার দাম ভালো পাওয়ায় লাভ হচ্ছে। প্রতি মণ পাট উৎপাদনে প্রায় ২ হাজার টাকা খরচ হয়। এখন বাজারে প্রতি মণে প্রায় ২ হাজার টাকা লাভ থাকছে। কিন্তু এই দাম কতদিন থাকবে, সেটাই চিন্তার বিষয়। এখনও অনেক পাট জাগ দেওয়া বাকি।’
একই উপজেলার হরিপুর গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, পাট কাটার ভরা মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত পানি না থাকায় দূরে নিয়ে পাট জাগ দিতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
তারপরও পাট নিয়ে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। কারণ, এই ফসল শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের আয়, গ্রামের কর্মসংস্থান এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির সম্ভাবনা। পাট কাটার পর একই জমিতে আমন ধান চাষের প্রস্তুতিও শুরু হয়। ফলে পাটের মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নতুন ফসলের অপেক্ষা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে। এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর। চলতি মৌসুমে পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন।এবড়মৎধঢ়যরপ জবভবৎবহপব
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পাটের আবাদ বেড়েছে। মৌসুমের শুরুতে খরা ও ডিজেল সংকট নিয়ে কৃষকদের কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল। পরে সময়মতো বৃষ্টি হওয়া ও জ্বালানি সংকট কেটে যাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়। কৃষকের পরিচর্যায় এবার পাটের ফলনও ভালো হয়েছে। তাঁর মতে, বাজারে পাটের বর্তমান দাম চাষিদের জন্য আশাব্যঞ্জক। এই দাম ধরে রাখা গেলে কৃষক আগের তুলনায় বেশি লাভবান হবেন। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও।