১ কার্তিক, ১৪৩৩
১৬ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের মিডিয়ায় ভয়াবহ প্রোপাগান্ডা

Admin Published: August 11, 2024, 12:50 pm
বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের মিডিয়ায় ভয়াবহ প্রোপাগান্ডা

ডিএনএন ডেস্ক :  রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে দেশজুড়ে অস্থিরতা চলছে। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও পুলিশের কর্মবিরতি অস্থিরতাকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ, এমনকি লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। এর বেশিরভাগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক, আবার কিছু ঘটনা সুযোগসন্ধানী অপশক্তি ঘটিয়েছে। তবে এ সহিংসতা ঘিরে ভারতের কতিপয় গণমাধ্যম প্রচার করছে উসকানিমূলক প্রতিবেদন। আর ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), টিকটক ও ইউটিউবের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে ভয়াবহ প্রোপাগান্ডা ও গুজব। সাম্প্রদায়িক রং মাখিয়ে বানানো এসব গুজব-প্রোপ্রাগান্ডার ঢেউ এসে পড়ছে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সোশ্যাল প্লাটফর্মেও। ফলে অস্থিরতা আরও উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে।

স্রোতের মতো ছড়াতে থাকা এসব প্রোপাগান্ডা ধরে ধরে শনাক্তে হিমশিম খাচ্ছেন ফ্যাক্ট-চেকাররা। বেশিরভাগ প্রোপাগান্ডাই যে ভয়াবহ এবং পরিকল্পিত সে কথাও বলছেন কেউ কেউ। রিউমার স্ক্যানার, ডিসমিসল্যাবের মতো ফ্যাক্ট-চেকিং বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমও এসব প্রোপাগান্ডা-গুজব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। রিউমার স্ক্যানার গত শুক্রবার (৯ আগস্ট) রাতে জানায়, তারা ভারতীয়দের ছড়ানো ২০টিরও বেশি গুজব শনাক্ত করেছে। পরে শনিবার (১০ আগস্ট) জানা যায়, ভারতীয়দের ছড়ানো মারাত্মক পর্যায়ের গুজব শনাক্ত হয়েছে ৩০টির বেশি।


তারা জানায়, গত ৭ আগস্ট বিকেলে এক্সে মোহন গৌড়া নামে আইডি থেকে একটি ছবি পোস্ট করে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ-আসাম সীমান্তে শরণার্থীদের ভিড় তৈরি হয়েছে’। অথচ যে ছবি পোস্ট করা হয়েছে, সেটি ২০১৮ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দুই দেশে বসবাসরত বিচ্ছিন্ন আত্মীয়দের মিলনমেলার ছবি। ৭ আগস্ট বিকেলেই এক্সে সালওয়ান মোমিকা নামে আইডি থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে ইরাকের মতো হিন্দু নারীদের বন্দি করে বিক্রি করা হচ্ছে’। অথচ ওই ভিডিওটি বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেত্রীকে বেঁধে রাখার সময়ের। 

সেদিন সন্ধ্যায় ‘দ্য জয়পুর ডায়লগস’ নামে ভেরিফায়েড এক্স আইডিতে একটি ভিডিও পোস্ট করে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে হিন্দু নারীদের ধর্ষণ ও হত্যা করা হচ্ছে। তারা গণহত্যার ঝুঁকিতে’। অথচ ওই ভিডিও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকার আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীদের বিচারের দাবিতে মৌন প্রতিবাদী নাটকের। ৭ আগস্ট সকালে ‘সুদর্শন নিউজ’ নামে ভেরিফায়েড এক্স আইডিতে একটি ভিডিও পোস্ট করে বলা হয়, ‘লক্ষ্মীপুরে রাজন চন্দ্র নামে এক হিন্দুর দোকান আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে’। অথচ ওই ভিডিও লক্ষ্মীপুরেরই মজুচৌধুরীর একটি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের।  ৬ আগস্ট ‘র‌্যান্ডমসেনা’ নামে ভেরিফায়েড এক্স আইডিতে একটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হয়, ‘আরেকটি হিন্দু মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়েছে’। অথচ ওই ভিডিও সাতক্ষীরার রাজপ্রাসাদ রেস্টুরেন্টে আগুনের ঘটনার। 

৬ আগস্ট দুপুরে ‘বাবা বেনারস’ নামে ভেরিফায়েড এক্স আইডিতে একটি পোস্টে দাবি করা হয়, ‘রংপুরে দুই শিশুসহ ৬ নারীকে ধর্ষণের পর পুড়িয়ে মারা হয়েছে’। অথচ রংপুরে এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। ৫ আগস্ট রাতে ‘হিন্দুত্ব নাইট’ নামে এক্স আইডিতে একটি ভিডিও পোস্ট করে লেখা হয়, ‘বাংলাদেশের হিন্দু ক্রিকেটার লিটন দাসের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে’। অথচ ওই ভিডিওটি মাশরাফির বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনার। তাছাড়া, লিটন নিজে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, তার বাড়িতে এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তিনি নিরাপদে ও ভালো আছেন। 

 ৬ আগস্ট মধ্যরাতে ওই একই আইডিতে আরেকটি ভিডিও দিয়ে পোস্টে দাবি করা হয়, ‘হিন্দু বৃদ্ধকে মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ’ অথচ ওই ভিডিওটি ঝিনাইদহের আওয়ামী লীগ নেতা শহিদুল ইসলাম হিরণের মৃতদেহের। এছাড়া চাঁদপুরের আলোচিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম খানের মৃতদেহের ভিডিওকে প্রচার করা হয়েছে হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে মারার ভিডিও বলে। ২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধ বিহারে সহিংসতার ভিডিওকে প্রচার করা হয়েছে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে। এদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবও শনাক্ত করেছে কিছু গুজব। এর মধ্যে, ৫ আগস্ট রাতে একটি গুজব এক্স-এর ‘ডেইলি লেটেস্ট আপডেটস’ নামে ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়েছে। সেই অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করে বলা হয়, চট্টগ্রামের নবগ্রহ মন্দিরে হামলা ও আগুন দেওয়া হয়েছে।

এক্স-এর তথ্য অনুসারে, অ্যাকাউন্টটি ভারত থেকে পরিচালিত হয়। যাচাইয়ে নেমে সাঈদ খান সাগর নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারীর এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টে বলা হয়,  নবগ্রহ মন্দিরে হামলার দাবিটি একটি প্রোপাগান্ডা।  যোগাযোগ করা হলে পোস্টদাতা জানান, চট্টগ্রামের লালদিঘী পাড় সংলগ্ন নবগ্রহ মন্দিরে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। তাকে এক্সে প্রচারিত ভিডিওটি পাঠানো হলে, তিনি বলেন যে এটি মূলত মন্দিরের কাছাকাছি অবস্থিত চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং ভাঙচুরের ঘটনায় সৃষ্ট আগুন। তিনি অক্ষত মন্দিরের ছবি পাঠিয়ে জানান, মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক স্বপন দাসও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একই ভিডিওটি প্রচার হতে দেখা যায় ভারতের গণমাধ্যম রিপাবলিক টিভিতে। ৬ আগস্টে রিপাবলিক বাংলার অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেল থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওর শিরোনাম করা হয়, “চট্টগ্রামে লালদিঘি পাড় নবগ্রহ মন্দির ভাঙচুর #shorts। ” অথচ খবরটি পুরোপুরি বানোয়াট। 

অন্যদিকে এএফপির বাংলাদেশের ফ্যাক্ট-চেকবিষয়ক সম্পাদক কদরুদ্দিন শিশিরও কিছু গুজব-প্রোপাগান্ডা শনাক্ত করে তার ফেসবুক আইডিতে শেয়ার করেছেন। এর মধ্যে একটি হলো, ‘গত কয়েকদিন ধরে একটি কথিত মেসেজ কনভারসেশনের স্ক্রিনশট পোস্ট করে দেখানো হচ্ছে যে, কোটা আন্দোলন চলাকালে কোনো মেসেজ গ্রুপে একটি হিন্দু মেয়েকের ধর্ষণের ছবি দিয়ে গর্বভরে প্রচার করছে মৌ/লবাদী স/ন্ত্রাসীরা। তবে যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, একই রকম ছবি ২০২১ সালে ভারতে একজন নারীর ধর্ষিত হওয়ার খবরের সাথে প্রকাশিত হয়েছিল। ’


এছাড়া, নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় এক নারীকে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তোলার একটি ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দাবি করা হয়, এক হিন্দু তরুণীকে অপহরণ করা হয়েছে। তবে দেশের মূলধারার গণমাধ্যম প্রতিবেদন করে জানিয়েছে, ঘটনাটি সাম্প্রদায়িক হামলা বা সহিংসতার ঘটনা ছিল না। ওই নারীকে অপহরণের চেষ্টা করেছিলেন তার স্বামী। গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দাম্পত্য বিরোধের জেরে স্বামীর ঘর থেকে বাবার বাড়িতে চলে এসেছিলেন ওই নারী। তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তার স্বামীসহ কয়েকজন ব্যক্তি। তখন ওই নারীর চিৎকার শুনে গ্রামবাসী এগিয়ে আসেন। তারা মাইক্রোবাসটি ভাঙচুর করেন। এ সময় ওই নারীর স্বামীসহ তিনজনকে তারা আটক করেন। আটক ব্যক্তিদের সেনাবাহিনীর কাছে সোপর্দ করা হয় বলে জানায় গ্রামবাসী।

কদরুদ্দিন শিশিরও বিষয়টি তার আইডিতে শেয়ার করেছেন। এক্ষেত্রে বিদেশে থাকা এক ব্যক্তির একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। সিলেটে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণেরও একটি খবর ছড়ানো হয়। রিউমার স্ক্যানারের সিনিয়র ফ্যাক্ট-চেকার সোহানুর রহমান একটি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানান, সিলেটে যে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে, তারা আওয়ামী লীগের নেতা। এই তথ্য দিয়েছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। ওই সংগঠনের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি এখন পর্যন্ত জানি, কোনো নিরীহ হিন্দু সিলেটে আক্রান্ত হননি। যারা হয়েছেন, তারা আওয়ামী লীগের নেতা।