১ কার্তিক, ১৪৩৩
১৬ অক্টোবর, ২০২৬
দুই দিনে কেজিতে বেড়েছে ১০-২০ টাকা

ডিজেলের দামের প্রভাব সবজির বাজারে

Admin Published: September 23, 2026, 1:46 pm
ডিজেলের দামের প্রভাব সবজির বাজারে

ডিএনএন ডেস্ক: রাজধানীর কারওয়ান বাজার। মঙ্গলবার বিকেল প্রায় ৪টা। পাকা আড়তখ্যাত মার্কেটের ঠিক পশ্চিম পাশের সড়কে দাঁড়িয়ে আছে ছোট একটি ট্রাক। দেড় টন ওজন বহনকারী ট্রাকটি থেকে বস্তাভর্তি গাজর মাথায় নিয়ে শ্রমিকরা ছুটছেন হাসিনা মার্কেটের ভেতরে। তাদের পেছন ধরে মার্কেটের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, একটি খালি আড়তে গাজরের বস্তাগুলো রাখা হচ্ছে।পাশেই দাঁড়ানো ট্রাকচালক আলমগীর হোসেন ভাড়া বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জানান, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার একটি হিমাগার থেকে ২৭ বস্তা গাজর নিয়ে এসেছেন। ভাড়া পেয়েছেন আড়াই হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘আগে ভাড়া ছিল দুই হাজার ৩০০ টাকা, এখন ২০০ টাকা বেশি নিলাম। পরিচিত কাস্টমার, এই জন্য ভাড়া বেশি বাড়াইনি। অপরিচিত হলে ৫০০ টাকা বেশি নিতাম।’


তাঁর ভাষ্য, ট্রাকটি এক লিটার ডিজেলে প্রায় ছয় কিলোমিটার চলে। ৫০ কিলোমিটার দূরত্বে গেলে দুদিন আগের তুলনায় এখন অতিরিক্ত ১৬০ টাকার বেশি তেল খরচ হয়। সে জন্য ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে।

কথা হয় ওই গাজরের মালিক আড়তদার আবদুল হান্নানের সঙ্গে, যিনি নিজেও পাঁচটি ট্রাকের মালিক। ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি জানান, ডিজেলের সঙ্গে সবকিছুর দাম সম্পৃক্ত। এই যে ২০০ টাকা বেশি ভাড়া দিতে হয়েছে, এই টাকা তো গাজর বিক্রি করেই তুলতে হবে। তাহলে কেজিতে কত বাড়বে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ধরেন, সোমবার দর ছিল ৫০ টাকা; আজ হবে ৫৫ টাকা। কিন্তু খুচরা পর্যায়ে কত বাড়বে, তা বলা যাচ্ছে না।’


টানা কয়েক মাস ধরে নিত্যপণ্যের বাজারে দামের অস্বস্তিতে ভুগছেন ভোক্তারা। নতুন করে ডিজেলের লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর বাজার যেন ফুঁসে উঠছে। শুরুতেই প্রভাব পড়েছে সবজি ও ডিমে। মাত্র দুদিনের ব্যবধানে সবজির কেজিতে ১০ থেকে ২০ এবং ডিমের ডজনে ৫ টাকা বেড়েছে। 


পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন সবজি-মাছ ও অন্যান্য পণ্য ঢাকায় আসে। পরিবহন ভাড়া বাড়লে প্রথমে এসব পণ্যের ওপরই প্রভাব পড়ে। তারা জানান, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে ট্রাকের ভাড়া বেড়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পণ্যের দামে। তাদের বক্তব্য, শাকসবজির পাশাপাশি নতুন করে এখন যেসব ভোগ্যপণ্য বাজারে আসবে, সেগুলোর দামও বেড়ে যেতে পারে।


গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর ওই সপ্তাহে বাজারে সবজির দর কিছুটা বেড়ে যায়। এরপর আবার কিছুটা কমতে থাকে। গত রোববার রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পটোল ও ঢ্যাঁড়শ ৪০ থেকে ৬০, ঝিঙে, ধুন্দুল, লম্বা বেগুন ও উচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া কাঁচামরিচের কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়।

গতকাল রাজধানীর মহাখালী, কলমিলতা কাঁচাবাজার, তেজগাঁও কলোনি বাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পটোল ও ঢ্যাঁড়শের কেজি ৬০ থেকে ৮০, ঝিঙে, ধুন্দুল, লম্বা বেগুন ও উচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ এসব সবজির কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা দর বেড়েছে। কাঁচামরিচের কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা।


পাইকারিতে দর বাড়লে খুচরা পর্যায়ে কী প্রভাব পড়বে– এ বিষয়ে মহাখালী কাঁচাবাজারের খুচরা সবজি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যাপারীরা কৃষকের কাছ থেকে সবজি কিনে ট্রাকে করে ঢাকায় আনেন। এরপর তারা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। পাইকারদের থেকে খুচরা বিক্রেতারা কিনে এনে ভোক্তার কাছে বেচেন, অর্থাৎ কৃষক থেকে খুচরা গ্রাহকের কাছে যাওয়ার আগে আরও তিন ধাপে ব্যবসা হয়। এখন ডিজেলের কারণে ব্যাপারী এক টাকা বাড়ালে পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা আরও এক টাকা করে বাড়াবেন, অর্থাৎ তিন ধাপে তিন টাকা বাড়তি যুক্ত হবে। এভাবেই দাম বাড়ে।


কলমিলতা বাজারের সবজি ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘হঠাৎ করি ডিজেলের দাম বাড়াইল সরকার। অহন এমন কোনো কিছুই বাদ থাকবে না, সব জিনিসের দর বাড়বে। আইজ না হোক, কাল হলেও বাড়বে।’


তিনি বলেন, ‘গাড়ির মালিকরা ট্রাক ভাড়া বাড়াইছে। ব্যাপারীরা যহন ট্রাক ভাড়া বেশি দিব, তখন হ্যারা (তারা) সবজিও বেশি দামে বেচব। তার মানি খুচরা কাস্টমারের কাছে বেশি দামে বেইচতে হইব।’

ভোক্তা-সংশ্লিষ্টরা বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন ভাড়া বাড়বে। তবে এই বৃদ্ধিকে পুঁজি করে কেউ যেন অরাজকতা তৈরি করতে না পারে, সেদিকে সরকারকে কঠোর নজরদারি করতে হবে। 

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন সমকালকে বলেন, ব্যবসায়ীরা সব সময় দাম বাড়ানোর ইস্যু খোঁজেন। এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে চ্যাপ্টা হচ্ছে ভোক্তা। এখন ডিজেলের দর বৃদ্ধি জিনিসপত্রের দামকে আরও উস্কে দেবে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে উঠছে। কম আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। তিনি বলেন, বাজারে এখন আগের মতো নজরদারি নেই। কঠোর তদারকি ছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। 


জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, সারাদেশে তাদের কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। নজরদারি আরও বাড়ানো হচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের পক্ষে সব দিক নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।