স্টাফ রিপোর্টার: মাটির ঘ্রাণ আর মানুষের অধিকার-এই দুইয়ের মেলবন্ধনে যখন কোনো তরুণের স্বপ্ন ডানা মেলে, তখন জন্ম নেয় এক একটি নীরব বিপ্লব। বরেন্দ্রর তপ্ত জনপদে তেমনই এক বিপ্লবের নাম শামীউল আলীম শাওন। তিনি কেবল একজন উন্নয়নকর্মী কিংবা লেখক নন; বরং তিনি একবিংশ শতাব্দীর সেই সচেতন নাগরিক সত্তা, যিনি কলমকে করেছেন আন্দোলনের শাণিত অস্ত্র আর রাজপথকে বানিয়েছেন সৃজনশীল দ্রোহের ক্যানভাস। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন 'ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস)' আজ আর কেবল নাম নয়, বরং উত্তরবঙ্গের সামাজিক পরিবর্তনের এক অনিবার্য ব্র্যান্ড।
ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে চাকরী করবেন। বাহিনীতে ‘মিলিটারি ইন্টালিজেন্স’ কিংবা ‘প্যারা কমান্ডো’র গর্বিত সদস্য হবেন। নিজের জীবনের সর্বচ্চোটুকু দিয়ে মাতৃভূমি বাংলাদেশের জন্য দেশের মানুষের কল্যানে কাজ করবেন। যদিও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার সেই স্বপ্ন তার পূর্ণতা পায়নি। তবুও অপূর্ণ থাকে নি তার দেশের জন্য আর দেশের মানুষের কল্যানের জন্য কাজ করার ইচ্ছা। স্কুল জীবনের গন্ডি পেরোনোর পূর্বেই শুরু করেছেন দেশ আর দেশের মানুষের কল্যানে কাজ। এভাবেই ইতিমধ্যেই একযুগের অধিক সময় অতিবাহিত করেছেন তিনি। নিজের জীবনের মহা মূল্যবান ও স্বর্ণময় একযুগের বেশী সময় বির্সজনের পরও থেমে যান নি তিনি! এখনও সক্রিয় ভাবে প্রতিনিয়তই করেছেন দেশ আর দেশের মানুষের কল্যানে নানা ধরণের কাজ।
সেই মানুষটি হলেন লেখক ও উন্নয়নকর্মী মো. শামীউল আলীম শাওন। তিনি রাজশাহী তথা বরেন্দ্র অঞ্চলের উন্নয়ন গবেষণাধর্মী যুব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ-ইয়্যাস’র প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানাধীন হাতেম খাঁন ওয়াবদা কলাবাগান এলাকায় তার বাড়ি। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে রাজশাহী কোর্ট কলেজ থেকে স্নাতক ও রাজশাহী নিউ গভঃ ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়াও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগ থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন ইনফরমেশন টেকনোলজি (পি.জি.ডি-ইন-আইটি) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সংস্কৃতি অনুরাগী এ মানুষটি লোকজ সংস্কৃতি চর্চাকারী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়’র সভাপতি হিসেবেও রয়েছেন।
সে বাবা ও মায়ের বড় সন্তান। তিনি বর্তমানে ঘোড়ামারা প্রধান ডাকঘরে মেইল শাখায় পোস্টাল অপারেটর (দৈনিক মজুরী ভিত্তিক) পদে কর্মরত। তার বাবা মো. শাহীনূরুল ইসলাম বাংলাদেশ ডাক বিভাগের পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর)। ছোট বোন নুসরাত জাহান তাসনিম সম্প্রতি ডিপ্লোমা নার্সিং সম্পন্ন করেছেন এবং বিএনএমসি থেকে নিবন্ধন প্রাপ্ত হয়েছেন। তার মমতাময়ী মা শাপলা শাহীন। তিনি তাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে পারি জমিয়েছেন ২০১০ সালের মে মাসে। ২০২৪ সালে ১৩ অক্টোবর মেঘলা খাতুনের সাথে বিবাহ বন্ধনে হন শামীউল। বর্তমানে তাদের সন্তান নূর মোহাম্মদ মুত্তাজিম-এর বয়স প্রায় দেড় বছর।
শাওন তার পেশাগত জীবনে রাজশাহীর আঞ্চলিক পত্রিকা দৈনিক ‘সোনার দেশ’র ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘সিল্কসিটি নিউজ’র নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন। জাতীয় দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’র অনলাইন বিভাগে শিক্ষানবিস প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও দেশের প্রথম বাইলিঙ্গুয়াল অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘ভিউজ বাংলাদেশ’র রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান সময়ে ‘ইত্তেফাক’ ‘সংবাদ’ ও ‘ভোরের কাগজ’ সহ দেশের বিভিন্ন জাতীয় এবং স্থানীয় দৈনিক ও অনলাইন পত্রিকার সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় পাতায় তার লেখা কলাম প্রকাশিত হয়। তার লেখায় উঠে আসে সমাজের নানা অসংগতি, সমস্যা আর সম্ভাবনার কথা।
বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত তার উল্লেখযোগ্য কিছু লেখা হলো : ‘ধর্ষণরোধে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী’ (এফএনএস), রাজশাহী: ‘সবুজ নগরী’ থেকে ‘উষ্ণায়ন কেন্দ্র’ (এফএনএস) ‘অনিরাপদ সড়ক, সমাধান কোথায়?’ (সংবাদ), ভাড়া ‘নির্ধারণ’ কিংবা ‘নিয়ন্ত্রণ করবে কে? (সংবাদ), ‘অপর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট’ (সংবাদ), ‘শিক্ষা: ক্লাসরুম মৃত, বাণিজ্য জ্যান্ত’ (ইত্তেফাক), ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি ও আমাদের বিবেক’ (ইত্তেফাক), ‘সমাধান মিলবে কোথায়?’ (ভোরের কাগজ) প্রভৃতি।
শামীউল আলীম শাওন রাজশাহীর এমন এক কণ্ঠস্বর, যিনি একদিকে কলমের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের পথ দেখান, আর অন্যদিকে রাজপথে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব দেন।
নিজের ছেলে বেলার কথা বলতে গিয়ে লেখক ও উন্নয়নকর্মী মো. শামীউল আলীম শাওন বলেন, ‘আমি যখন অনেক ছোট, তখন থেকেই ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা শেষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসার হব। আমার গোয়েন্দা হওয়ার ইচ্ছা ছিল প্রবল। তাই ভাবতাম সেনাবাহিনীতে চাকরী পেলে ‘মিলিটারি ইন্টালিজেন্স’ বা ‘সামরিক গোয়েন্দা’ হওয়ার চেষ্টা করবো। আর সেখানে সর্বচ্চোটুকু মেধার আর শ্রম দিয়ে কাজ করবো দেশ ও দেশের মানুষের কল্যানে কাজ করার। আর যদি কখনও সুয়োগ হয় সেক্ষেত্রে প্যারা কমান্ডোতে চলে যাবো।’
সমাজসেবী বা উন্নয়নকর্মী হয়ে ওঠার শুরুটা কিভাবে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রায় ১৭ বছর আগে ২০০৮ সালের দিকে আমি তখন স্কুলে পড়ি। নবম শ্রেনীর ছাত্র। হঠাৎ-ই একদিন স্কুলের দেয়ালে আটকানো একটি পোস্টার থেকে সন্ধান পাই ‘গোল্ডেন বয়েজ কমিটি’ নামের এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের। কৌতুহল থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করি। এরপর তাদের সাথে যুক্ত হয়। সমাজ নিয়ে ভাবনার উদ্ভব হয়, সেবামূলক কাজ সম্পর্কে জানতে শুরু করি। অতপর এক সময় সংগঠনে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে স্থান পায়। সেই থেকে শুরু দেশে ও দেশের তথা সমাজ নিয়ে কাজ করা।’
২০০৮ সাল থেকে ২০১৪/১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় একটানা ৬/৭ বছর সেই সংগঠনে সফলতার সাথে বিভিন্ন ধরণের কাজ করি বলে উল্লেখ করে তরুণ উন্নয়নকর্মী শামীউল বলেন, ‘শুরু থেকেই আমি সড়ক দূর্ঘটনা বন্ধ করার বিষয়ে কাজ করতাম। সম্ভবত ২০১৪ সালের দিকে ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের যাত্রা নিরাপদ করার দাবিতে তৎকালীন সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রীকে আমি একটি স্মারকলিপি প্রদান করি। আমার স্মারকলিপি পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে বেশ গুরুত্বের সাথে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ফলে আমি আরো বেশি উৎসাহিত হয়। আর ২০১৫ সালের শুরুর দিকে এসে সমাজ ও জীবন ঘনিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বেশ সচেতন হই।
সেই বছরের জুন মাসের শেষের দিকে কি জুলাই মাস। হঠাৎ আমার বন্ধু শাহরুখ শুভ ও আমি উপলদ্ধি করি যে, সমাজের মানুষের জন্য কাজের জন্য সাংগঠনিক ভিত্তি প্রয়োজন। এরপর আমাদের আরেক বন্ধু মাশরুহকে সাথে নিয়ে তিনজন একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় একটি সংগঠন তৈরির এবং ‘ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ-ইয়্যাস’ নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরি করি। প্রতিষ্ঠা পরবর্তী এক দশক সময় ধরে এ সংগঠনটি পরিচালনা করে চলেছি।’
শামীউলের সার্বিক দিক-নির্দেশনায় পরিচালিত কর্মসূচির ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যানে অবদান রাখায় ২০২৫ ও ২০২৪ সালে ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ-ইয়্যাস যথাক্রমে ‘বেস্ট ইয়ুথ অর্গানাইজেশন অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’ ও ‘দি বেস্ট ইয়ুথ অর্গানাইজেশন ইনিশিয়েটিভ অ্যাওয়ার্ড-২০২৪ এবং ২০১৯ সালে সংগঠনটি তার সাংগঠনিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘দি বেস্ট ক্যাম্পেইনার অ্যাওয়ার্ড-২০১৯’ অর্জন করে। আর সৃজনশীল ও সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০২০ সালে ‘শ্রেষ্ঠ যুব’ সম্মাননা পান তিনি। এছাড়াও নানামুখি কাজের জন্য ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ-ইয়্যাস-কে হেল্পিং জোন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক ‘বেস্ট ফ্রেন্ডলি অর্গানাইজেশন’ ও রোটার্যাক্ট ক্লাব অফ এ্যপ্রোচ রাজশাহী কর্তৃক ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
শাওনের পুরো কাজের দর্শন একটি কেন্দ্রবিন্দুতে আটকে আছে-‘নেতৃত্ব মানে পদ নয়, নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব।’ তিনি বিশ্বাস করেন, একজন নাগরিক যদি সচেতন হয়ে নিজের অধিকার বুঝে নিতে শেখে এবং নিজের দায়িত্ব পালন করে, তবে সমাজ এমনিতেই বদলে যাবে।
শামীউল আলীম শাওন বলেন, ‘কাজের স্বীকৃতি বা সম্মাননা পেলে সকলেরই ভালো লাগে এটা সত্যি। তবে কখনও পুরস্কার কিংবা সম্মাননা পাওয়ার জন্য কাজ করি না। নিজের ভালো লাগা থেকে কাজ করি। নাগরিক হিসেবে নিজের দায়দ্ধতা থেকে কাজ করি সমাজের জন্য। আগামীতেও দেশ ও সমাজের মানুষের কল্যানে কাজ করে যেতে চাই।’