ডিএনএন ডেস্ক: উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার পথে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে অন্তত ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের চারজনসহ তিন উপজেলার ১০ জন রয়েছেন বলে স্বজনরা নিশ্চিত করেছেন। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটের কারণে তারা প্রাণ হারিয়েছেন।
স্থানীয় সাংবাদিক উমেদ আলী জানান, তাঁর ভাগনে নুরুজ্জামান সরদার ময়না এ ঘটনায় মারা গেছেন। একই গ্রামের রোহান আহমেদ জানিয়েছেন, তিনিও একই বোটে ছিলেন। তাঁর চোখের সামনে এই চারজনসহ অন্যদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চারজন, দোয়ারাবাজারের একজন ও জগন্নাথপুরের পাঁচজন রয়েছেন বলে স্থানীয় নানা সূত্রে জানা গেছে। দিরাই উপজেলার চারজন হলেন উপজেলার তারাপাশা গ্রামের আবু সাঈদ সরদারের ছেলে নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে শাহান মিয়া (২৫) ও রনারচর গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮)।
দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম এবং জগন্নাথপুরের চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁওয়ের শায়েখ আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুরের মো. নাঈম, পাইলগাঁওয়ের আমিনুর রহমান ও ইছগাঁওয়ের মোহাম্মদ আলী।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় খাবার ও পানির সংকটে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা। পরে অনেকেই মারা যান। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
নিহতদের স্বজনরা জানান, দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের ওয়াকিব মিয়ার ছেলে মুজিবুর রহমানের সঙ্গে জনপ্রতি ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করে তারা লিবিয়া হয়ে গ্রিসে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। চুক্তি অনুযায়ী বড় ও নিরাপদ নৌকায় করে যাত্রার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
স্থানীয়রা দ্রুত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত মানব পাচার চক্রকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জীব সরকার বলেন, নিহতের পরিবারের কেউ যোগাযোগ করেনি। এ জন্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় সাংবাদিকসহ এলাকার কেউ কেউ এমন সংবাদ জানিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, নিহত চারজন কুলঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা।
ছয় দিন ধরে অভুক্ত অবস্থায় নৌকায় ভাসছিলেন তারা
এএফপি জানায়, উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় একটি রাবারের নৌকায় সমুদ্রে ভাসছিলেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। তবে ছয় দিন ভেসে থাকার পর গ্রিসের উপকূলে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ডুবে যায় নৌযানটি। এতে নৌকায় অভুক্ত থাকা ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা গ্রিসের কোস্টগার্ডকে এ তথ্য জানিয়েছেন। জীবিত উদ্ধার হওয়ার ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ বাংলাদেশি রয়েছেন।
শুক্রবার গভীর রাতে কোস্টগার্ড জানায়, ক্রিট দ্বীপের কাছে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার একটি জাহাজ এক নারী, এক শিশুসহ ২৬ জনকে উদ্ধার করেছে। পরে কোস্টগার্ড এএফপিকে জানায়, তাতে ২১ বাংলাদেশি, চার দক্ষিণ সুদানি এবং একজন শাদের নাগরিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানিয়েছেন, জাহাজে থাকা মানব পাচারকারীদের একজনের নির্দেশে মরদেহ ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, বেঁচে যাওয়া দুজনকে ক্রিটের হেরাকলিয়নের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের বিবৃতির ভিত্তিতে কোস্টগার্ড জানিয়েছে, নৌকাটি ২১ মার্চ পূর্ব লিবিয়ার বন্দর শহর তোবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। গ্রিস হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নে আশ্রয়প্রত্যাশী বহু অভিবাসীর প্রবেশদ্বার।
এ ঘটনায় গ্রিক কর্তৃপক্ষ দুই দক্ষিণ সুদানি যুবককে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের পাচারকারী বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। দলটিকে বহনকারী জাহাজটি দক্ষিণ ক্রিটের শহর ইয়েরাপেত্রা থেকে ৫৩ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে ছিল।