৬ কার্তিক, ১৪৩৩
২১ অক্টোবর, ২০২৬

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের ঘোড়ার গাড়ি

Admin Published: October 21, 2026, 1:24 pm
কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের ঘোড়ার গাড়ি

নুরুজ্জামান : ঘোড়ার গাড়ি আমাদের সভ্যতার এক দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী বাহন। একসময় পুরান ঢাকা ইতিহাসের সাক্ষী ঘোড়ার গাড়ির দৃশ্য ও গ্রাম বাংলার প্রধান যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের মাধ্যম হলেও, আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার ভিড়ে এটি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে । গ্রাম বাংলার পথে-প্রান্তরে যাত্রী ও কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ায় ঘোড়ার গাড়ির জুড়ি ছিলনা অতিতে। তবে এখন এটি বিলুপ্তির পথে, তার পরেও যারা এই পরিবহন দেখতে চান, তাদেরকে আসতে হবে-রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে । 

 

অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে ,রাজশাহী শহরে এক সময় ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন ছিল । তবে এখন সেটি তেমন আর দেখা যায় না । এই জেলার বাঘা উপজেলার দুর্গম পদ্মার চর থেকে হাট-বাজারে কৃষিপণ্য পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। পেঁয়াজ, রসুন, আলু , বেগুন ও বাদাম-সহ নানা ফসল বোঝাই করে মেঠোপথ পেরিয়ে বাজারে ছুটত এসব গাড়ি। গাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অনেক মানুষের জীবন-জীবিকা। কিন্তু সময় বদলেছে। উন্নত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা, বেড়েছে ভ্যান , ট্রাক, পিকআপ ও টলারচালিত নৌকার চলাচল। ফলে এক সময়ের পরিচিত এই বাহন এখন প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে।


বাঘা উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়ির সেই ব্যস্ততা আগের মত আর চোখে পড়ে না। হাতে গোনা কয়েকজন চালক এখনো ঐতিহ্যবাহী এ পেশা ধরে রেখেছেন। তাঁদের কাছে ঘোড়ার গাড়ি কেবল জীবিকার মাধ্যম নয়, অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখারও একটি অবলম্বন। স্থানীয় ভাবে ঘোড়ার গাড়ি চালকদের বলা হয় ‘কচুয়ান। চরাঞ্চলের ঘোড়ার গাড়িচালক আঞ্জুম হোসেন, আশরাফুল ও আব্দুস সালাম জানান, এক সময় চরাঞ্চলে যাতায়াতের উপযোগী সড়ক ছিল সীমিত। নদীপথেও টলারচালিত নৌকার চলাচল ছিল না। ফলে উৎপাদিত ফসল বিভিন্ন হাটবাজারে পৌঁছে দিতে ঘোড়ার গাড়ির ওপরই নির্ভর করতে হত কৃষকদের । আর এই বাহন চালিয়েই চলত তাঁদের সংসার। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিক পরিবহনের প্রসারে বদলে গেছে সেই চিত্র। 


চরাঞ্চল থেকে কৃষিপণ্য পরিবহনে এখন বিকল্প অনেক বাহন রয়েছে। দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়া এবং বেশি মাল বহনের সুবিধার কারণে ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা যন্ত্রচালিত যানবাহনের দিকে ঝুঁকেছেন। এতে কমেছে ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা। চালকদের ভাষ্য, প্রায় অর্ধশত মানুষ পুরোনো পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। তবে মানিকের চর এলাকায় এখনো বাঘা থেকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও ভেড়ামারা এলাকায় কৃষিপণ্য পরিবহনে ভাড়া খাটেন প্রায় ১০-১২১টি ঘোড়ার গাড়ি।


চরাঞ্চলের আশিতিপর বৃদ্ধ সাবেক গ্রাম পুলিশ নুরমোহাম্মদ জানান, আগের মতো ঘোড়ার গাড়ি না থাকলেও একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। আদি পেশার প্রতিটান থেকে এখনো দশ-বারো জন ব্যক্তি এ বাহন চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার একসময় শুধু রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পাশ্ববর্তী নাটোর জেলার লালপুর উপজেলা থেকে গোপালপুর এবং বিলমাড়িয়ায় ধারাবাহিক ভাবে চলতো এই পরিবহন। এ ছাড়াও সিরাজগঞ্জের যমুনার চরাঞ্চল, পুরান ঢাকা, মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, নওগাঁ, কুষ্টিয়া ও যশোরের বিভিন্ন এলাকায়ও ছিল এর চলাচল। গ্রামীণ জনপদে কৃষিপণ্য পরিবহনের পাশাপাশি মানুষের যাতায়াতেও এ বাহনের ভূমিকা ছিল। সময়ের পরিবর্তনে শহরাঞ্চল থেকে এটি প্রায় হারিয়ে গেলেও কোথাও কোথাও এখনো টিকে আছে এর ক্ষীণ অস্তিত্ব।


ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবন সংগ্রামের ইতিহাস। একটি ঘোড়া , কাঠের গাড়ি আর চালকের শ্রম-এই সমন্বয়েই চলত চরাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার বিস্তারে সেই দৃশ্য বদলে গেলেও ঘোড়ার গাড়ি বিগত দিনে কত মানুষের জীবিকার অবলম্বন ছিল, তা ভুলে যাওয়ার নয়। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষের জীবন সহজ করেছে, কৃষিপণ্য পরিবহনেও এনেছে গতি। তবে উন্নয়নের এই ধারায় হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণও জরুরি। 


পুরোনো ছবি সংগ্রহ, ঘোড়ার গাড়ি চালকদের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করা এবং স্থানীয় ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই বাহনের ইতিহাস তুলে ধরা যেতে পারে। বহুকাল থেকে রাজশাহী আমের জন্য পরিচিত, টিকে আছে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক স্থাপনা পুঠিয়া রাজবাড়ী, সুলতান আমলে প্রতিষ্ঠিত বাঘার শাহী মসজিদ-সহ অসংখ্য পুরনো দালান কোঠা। কিন্তু পদ্মার চর থেকে হাটবাজারে ফসল বহন করা ঘোড়ার গাড়ি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে জনজীবনের পরিচিত দৃশ্য থেকে। হয়তো একদিন এই বাহন আর চলবে না চরাঞ্চলের মেঠোপথে। তখন পুরোনো ছবি আর কচুয়ানদের স্মৃতিই হয়ে থাকবে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের সাক্ষী।