১১ বৈশাখ, ১৪৩৩
২৪ এপ্রিল, ২০২৬

কলেজ শিক্ষিকাকে বিএনপি নেতার জুতাপেটা, নেপথ্যে কী

Admin Published: April 24, 2026, 5:36 pm
কলেজ শিক্ষিকাকে বিএনপি নেতার জুতাপেটা, নেপথ্যে কী

ডিএনএন ডেস্ক: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে শিক্ষিকাকে জুতাপেটা, কলেজে ভাঙচুর ও শিক্ষকদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। চাঁদা না পেয়ে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী শিক্ষকদের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন মহলে শুরু হয় কড়া সমালোচনা।


কেউ ঘটনার জন্য দায়ী করছেন ওই শিক্ষিকাকে আবার কেউ দায়ী করছেন বিএনপি নেতাকে। এখন প্রশ্ন ‍উঠেছে, কীভাবে হলো এই ঘটনার সূত্রপাত?



প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে উঠে এসেছে সেই চিত্র। তারা বলছেন, বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুরে কলেজ ক্যাম্পাসে ২০২৪ সালের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষাকেন্দ্র হওয়ায় কলেজ ও আশপাশের ১০০ গজ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল এবং সকাল থেকেই পুলিশ মোতায়েন ছিল।


এরই মধ্যে স্থানীয় জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলী, ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি শাহাদাত আলী, পুলিশের সাবেক এসআই ও ‌‌‌‘চাঁদাবাজ’ নামে পরিচিত বিএনপি নেতা আব্দুস সামাদসহ ৭-৮ জনের একটি দল দুপুরের দিকে কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করেন। এসময় তারা স্থানীয়ভাবে ইসলামী জালসার নামে চাঁদা দাবি করেন। এসময় আগের অধ্যক্ষের সময়ে কলেজের আয়-ব্যায়ের হিসাব চান তারা। এ নিয়ে বিএনপি নেতা ও শিক্ষকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।



এক পর্যায়ে সেখানে উপস্থিত প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা প্রতিবাদ জানিয়ে মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করতে থাকেন। এসময় হিরাকে বাধা দিতে যান বিএনপি নেতা শাহাদাত আলী। তখন ওই শিক্ষিকা শাহাদাতকে চড় মেরে বসেন। এরপর শাহাদাত তার পায়ের স্যান্ডেল খুলে ওই শিক্ষিকাকে পেটাতে থাকেন। এর জেরে ক্যাম্পাসে ওই শিক্ষিকাকে বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আফাজের ওপরও হামলা করেন।


এর কিছুক্ষণ পর বিএনপির নেতাকর্মীরা গিয়ে অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষকের ওপর হামলা চালান। পাশাপাশি ভাঙচুর করেন কলেজের অফিস কক্ষ। 



বিএনপি নেতাদের হামলায় কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা, অধ্যাপক রেজাউল করিম আলমসহ আরো দুই কর্মচারী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।  


এদিকে ঘটনার পর থেকে অব্যাহত হুমকির ভয়ে অনেকটা আত্মগোপনে আছেন কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, নারী শিক্ষক আলেয়া খাতুন হিরাসহ আরো কয়েকজন। ভয়ে তারা ফোন বন্ধ করে যে যার মতো করে অবস্থান করছেন।


স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুস সামাদের নেতৃত্বে স্থানীয় বিএনপির ওই গ্রুপটি দাওকান্দি কলেজ ও দাওকান্দি স্কুল থেকে প্রতিমাসে বিভিন্ন অজুহাতে চাঁদাবাজি করে আসছিল। এর বাইরে তারা ৫ আগস্টের পর দাওকান্দি বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, অফিস দখল, পুকুল দখলসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। তারা একটা বাহিনী গড়ে তুলে দাওকান্দিতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। এই বাহিনীর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করে না। 


অভিযোগ রয়েছে— ঘটনার সময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কোনো চেষ্টায় করেনি। ফলে প্রকাশ্যেই ওই নারী শিক্ষককে জুতাপেটাসহ কলেজে ভাঙচুর ও হামলা করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।


আহত শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতার নেতৃত্বে ৪০-৫০ জন নেতাকর্মী হামলায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে অন্যতম জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলী, সিনিয়র সহ-সভাপতি আফাজ আলী, বিএনপি নেতা শাহাদাত আলী, কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আলী, স্থানীয় বিএনপি নেতা এজদার আলী, ছাত্রদলের সাবেক নেতা রুস্তম আলী ও জামিনুর ইসলাম জয়। 


স্থানীয় বিএনপির আকবর আলী দাবি করেন, কলেজের পূর্বের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির হিসাব চাইতে গেলে উল্টো তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। তার ভাষ্য, ঘটনার সময় আলেয়া খাতুন হীরা প্রথমে আমাদের ওপর হামলা করেন, পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।


অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক অভিযোগ করেন, চার মাস আগে কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন গ্রুপ তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। তিনি এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করায় বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।


প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা বলেন, ‘বিভিন্ন সময় কলেজে এসে তারা হিসাব চাইতেন, মূলত চাঁদার দাবিই ছিল তাদের। অধ্যক্ষের পাশে থেকে প্রতিবাদ করায় আমিও হামলার শিকার হয়েছি।’


দুর্গাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কায় পুলিশ আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিল এবং উভয়পক্ষকে নিবৃত করার চেষ্টা করা হয়। তবে কিছু লোক জোরপূর্বক প্রবেশ করে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 


রাজশাহী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মুখপাত্র সাবিহা ইয়াসমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পুলিশ বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আজও একদল পুলিশ পাঠানো হয়েছে ঘটনাস্থলে। গোয়েন্দা নজরদারিও রাখা হয়েছে।’