৩ বৈশাখ, ১৪৩৩
১৭ এপ্রিল, ২০২৬

বনলতা এক্সপ্রেসের সফল যাত্রী

Admin Published: April 16, 2026, 5:43 pm
বনলতা এক্সপ্রেসের সফল যাত্রী

ডিএনএন ডেস্ক: দেখতে দেখতে ক্যারিয়ারের এক দশক পেরিয়ে গেছেন সাবিলা নূর। সময়ের এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি শুধু একজন অভিনেত্রী হিসেবে টিকে থাকেননি, বরং নিজেকে ক্রমাগত ভেঙেছেন, গড়েছেন, নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। এই এক দশক যেন তাঁর কাছে এক অবিরাম অনুশীলনের মাঠ; যেখানে প্রতিটি চরিত্র ছিল নতুন চ্যালেঞ্জ, প্রতিটি কাজ ছিল নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক নিরলস চেষ্টা। পাশের বাসার মেয়ে, বেকার প্রেমিকের কোমল প্রেমিকা কিংবা কর্মজীবী নারীর–এসব চরিত্র থেকে বের হয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে আরও পরিণত করেছেন তিনি।


নাটকের পাশাপাশি ওটিটির দুনিয়াতেও তাঁর পদচারণা ছিল আত্মবিশ্বাসী। একের পর এক কাজ দিয়ে প্রমাণ করেছেন–সাবিলা শুধু জনপ্রিয় নন, প্রয়োজনীয়ও। ছক ভাঙতে ভাঙতে নির্মাতাদের কাছে সাবিলা হয়ে ওঠেন ভার্সেটাইল অভিনেত্রী। নির্মাতাদের ভাষ্য ছিল, সাবিলাকে যে চরিত্রই দেওয়া হয়, তাতেই অনায়াসে মানিয়ে নিতে পারেন। 


পরিচালক হচ্ছেন নাটক বা সিনেমার ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ। সেই ক্যাপ্টেনরা যদি অভিনেত্রীকে এমন মন্তব্য দেন তাহলে তাঁর ক্যারিয়ারে বড় প্রাপ্তি হয়ে দাঁড়ায় সেটি। এই প্রাপ্তি নিয়ে ছোটপর্দাকে অনেকটা টাটা বাই বাই বলেন সাবিলা। যদিও অফিসিয়ালি কখনোই জানাননি আর নাটকে তাঁকে দেখা যাবে না। তবে তাঁকে আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কারণ ছোটপর্দার গণ্ডি পেরিয়ে সাবিলা নূর এখন বড়পর্দার বাসিন্দা। নাটক, বিজ্ঞাপন, ওয়েব সিরিজ, ওয়েব ফিল্মের পর তাঁর স্বপ্ন ছিল বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম চলচ্চিত্রে কাজ করা এবং সেখানেই নিয়মিত হওয়ার। সাবিলার সেই অপূর্ণতাটুকুও পূর্ণ হয় প্রথমবারের মতো ঢাকাই সিনেমার শীর্ষ তারকা শাকিব খানের বিপরীতে ‘তাণ্ডব’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে। প্রথম সিনেমাতেই নিজের কারিশমা দেখান তিনি। সিনেমাটির ‘লিচু বাগান’ গানটি তো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। সাবিলা হয়ে ওঠেন ফুল ফর্মে বাণিজ্যিক সিনেমার নায়িকা। 


ট্রেন যাত্রায় সফল



বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের ভিড়ে নিজের স্বতন্ত্র উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন সাবিলা নূর। ছোটপর্দার পরিচিত মুখ থেকে ধীরে ধীরে বড়পর্দায় পা রাখা এই অভিনেত্রী এবার যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার চিত্রা হয়ে। তাঁর ভাষায়, ‘চিত্রা হয়ে উঠতে আমি সব রকমের চেষ্টা করে গেছি’–এই একটি বাক্যই যেন তাঁর সর্বাত্মক পরিশ্রমের যাত্রার ইঙ্গিত দেয়। ঈদুল ফিতরের উৎসবমুখর আবহে মুক্তি পাওয়া ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এখনও প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের ভিড় টানছে। রাজধানীর মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে হাউসফুল শো যেন প্রমাণ করছে সিনেমাটির সফল যাত্রাকে। এই যাত্রারই এক গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী সাবিলা নূর। 


সিনেমাটি মুক্তির পর অভিনেত্রী নিজেই ছুটে গেছেন প্রেক্ষাগৃহে। বসুন্ধরা থেকে মহাখালী–দর্শকের প্রতিক্রিয়া কাছ থেকে দেখার এই অভিজ্ঞতা তাঁকে দিয়েছে এক অন্যরকম তৃপ্তি। বিরতির আগে দর্শকের মুখে হাসি, আর পরের অংশে আবেগে ভেসে যাওয়া–এই পরিবর্তন তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। একজন অভিনেতার জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? পর্দার চরিত্র যখন বাস্তবের মানুষের অনুভূতিতে জায়গা করে নেয়, তখনই তো অভিনয় সফল হয়। সাবিলা সেই সাফল্যের স্বাদ পেয়েছেন, পাচ্ছেন পুরোপুরি।


অদ্ভুত এক দিক আছে সাবিলা নূরের। তিনি নিজের সাফল্যে খুব বেশি থিতু হয়ে থাকেন না। বরং প্রতিটি কাজের পরই নতুন করে নিজেকে যাচাই করেন। সিনেমাটি তিনি একাধিকবার দেখেছেন, তবে প্রতিবারই যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছেন গল্পটিকে। নিজের অভিনয়ের খুঁত ধরার চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন দর্শকের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়াকে। তবুও তাঁর মধ্যে এক ধরনের শিল্পীসুলভ অস্থিরতা কাজ করে। সাবিলার ভাষ্য, ‘ভালো করার তো শেষ নেই।’ এই উপলব্ধিই তাঁকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি মনে করেন, আরও বেশি চেষ্টা করলে হয়তো আরও ভালো করা যেত। এই আত্মসমালোচনার জায়গাটিই একজন অভিনেতাকে দীর্ঘ পথ চলার শক্তি দেয়। সাবিলা সেই দূরের পথ সফলভাবে অতিক্রম করতেই যেনো ছুটছেন। 


সহশিল্পীদের সঙ্গে শেখার যাত্রা


‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমা তো বটেই তবে তার চেয়ে বেশি ছিল একঝাঁক শক্তিশালী অভিনেতার মিলনমেলা। এখানে কাজ করতে গিয়ে সাবিলা পেয়েছেন শেখার অসংখ্য সুযোগ। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন মোশাররফ করিমের অভিনয়ের কথা; যাকে তিনি ‘দুর্দান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। পাশাপাশি শামীমা নাজনীন, শরিফুল রাজ, চঞ্চল চৌধুরী, শ্যামল মাওলা, আজমেরী হক বাঁধন এবং জাকিয়া বারী মম–প্রত্যেকেই তাদের চরিত্রে প্রাণ ঢেলে দিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা সাবিলার জন্য ছিল এক ধরনের অভিনয়-ওয়ার্কশপের মতো। বড়দের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি শুধু অভিনয় নয়, শৃঙ্খলা, চরিত্রের গভীরতা এবং দৃশ্যের ভেতরে ডুবে থাকার কৌশলও শিখেছেন বলে জানিয়েছেন। তবে চিত্রা হয়ে ওঠার এই যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন নির্মাতা তানিম নূর। সাবিলার ভাষায়, তানিম নূরই তাঁকে ‘সত্যিকারের চিত্রা’ বানিয়ে ছেড়েছেন।


একজন পরিচালকের কাজ শুধু দৃশ্য ধারণ করা নয়, বরং অভিনেতার ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা। তানিম নূর সেই কাজটিই করেছেন বলে মনে করেন সাবিলা। ফলে শুটিং সেটে তাঁর নার্ভাসনেস ধীরে ধীরে কেটে গেছে, আর জায়গা করে নিয়েছে আত্মবিশ্বাস।


এবার রকস্টার 


বনলতা এক্সপ্রেস-এর সাফল্যের ঘোর নিয়েই রকস্টার সিনেমার শুটিং করছেন সাবিলা নূর। যে নায়কের সঙ্গে সিনেমায় অভিষিক্ত হয়েছেন সেই শীর্ষ তারকা শাকিব খান থাকছেন। মালয়েশিয়া হয়ে সিনেমাটির শুটিং এখন চলছে ঢাকায়। যে শুটিংয়ে অংশ নিয়েছেন সাবিলা। এরপরও সিনেমাটি নিয়ে যেন রহস্যময়ী নায়িকা। জানালেন কিছুই বলার নেই তাঁর। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলার আগ পর্যন্ত মুখ বন্ধ। ফলে রকস্টারে সাবিলার চরিত্রটি সম্পর্কে তেমন জানা যায়নি। বনলতা এক্সপ্রেসে যে চরিত্রে সাবিলাকে দেখেছেন দর্শকরা পরের যাত্রায় তার ছিটেফোঁটাও মিল নেই। এই সিনেমায় তাঁকে দেখা যাবে রকস্টারের প্রেমিকা হিসেবে। সিনেমাটি আগামী ঈদুল আজহায় মুক্তি পাবে। ঈদুল ফিতরে বনলতা এক্সপ্রেসের চিত্রা হয়ে সাফল্যের পর রকস্টার যাত্রায় কতটা সাফল্য আসে তা দেখার অপেক্ষায় অনুরাগীরা। এ ছাড়াও গোলাম মামুন ২ নামের একটি ওয়েব সিরিজ করার কথা রয়েছে তাঁর। যদিও এটির শুটিংয়ের দিনক্ষণ কিছুই এখন ঠিক নেই। তাই আপাতত শুধু রকস্টারেই থাকছেন। 


অল্পকথায়


সাবিলা নূরের বেড়ে ওঠা ঢাকায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে ভালোবাসতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নাচ, অভিনয় ও উপস্থাপনায় আগ্রহ ছিল প্রবল। ২০১৪ সালে একটি মোবাইল অপারেটরের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মিডিয়ায় অভিষেক হয় সাবিলার। এরপর থেকেই শুরু শোবিজ অঙ্গনে উজ্জ্বল যাত্রা। ‘ইউ টার্ন’, ‘ভালোবাসা ১০১’, ‘ফ্যামিলি ক্রাইসিস’, ‘বেডরুম ৩০২’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় নাটকে তাঁর অনবদ্য অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করে। শুধু অভিনয়েই নয়, উপস্থাপনার জগতেও সাবিলা নিজেকে প্রমাণ করেছেন। ‘মিরর গ্ল্যাম ফ্যাক্টর’, ‘সেলিব্রিটি গেম প্লে’সহ একাধিক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন তিনি।